মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে জড়ো হওয়া ইউরোপীয় নেতারা এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক নরম ভাষায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও ভেতরে ভেতরে উদ্বেগ কাটেনি। কারণ তাদের মনে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—বর্তমান মার্কিন নীতিতে ইউরোপকে শেষ পর্যন্ত একাই চলতে হতে পারে। আর এই বাস্তবতা সামনে আসতেই ইউরোপে অস্বস্তিকর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: ফ্রান্স কি এতদিন ঠিকই বলে আসছিল?
ট্রাম্প যুগের অনিশ্চয়তা ও ইউরোপের দুশ্চিন্তা
ইউরোপীয় মহলে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্থির নীতি ইউরোপে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে অনেকের কাছেই এখন মনে হচ্ছে, ফ্রান্সের পুরোনো সতর্কবার্তাকে হয়তো অবহেলা করা ঠিক হয়নি। ফ্রান্স বরাবরই ট্রান্সআটলান্টিক জোটের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান ছিল এবং নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতার পক্ষে জোর দিয়ে এসেছে।
দে গলের পুরোনো সতর্কবার্তা
ফ্রান্সের নেতা শার্ল দে গল ১৯৫৮ সালে ক্ষমতায় এসে পশ্চিমা মিত্রদের সতর্ক করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। পরে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেন, ন্যাটোর সমন্বিত সামরিক কাঠামো থেকে ফ্রান্সকে সরিয়ে নেন এবং ফরাসি মাটি থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে দেন।
ম্যাক্রোঁর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ডাক
বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ প্রায় এক দশক ধরে ইউরোপকে “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন”-এর আহ্বান জানিয়ে আসছেন। তবে ইউরোপের অনেক দেশ তার এ অবস্থানকে অতিরঞ্জিত বা অপ্রয়োজনীয় মনে করেছে। তিনি যখন ন্যাটোকে “মস্তিষ্ক-মৃত” বলেন, তখন মিত্রদের কেউ কেউ তা জোট ভাঙার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন। সম্প্রতি তিনি আরও কঠোর ভাষায় বলেছেন, ইউরোপ এখন এক ধরনের বৈরী আমেরিকার মুখোমুখি।

কেন ফ্রান্সের কথা গুরুত্ব পায়নি
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স হয়তো সময়ের আগেই সতর্ক করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতাকে ইউরোপ ঝুঁকি নয়, বরং স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখেছিল। ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের আরও ঘনিষ্ঠ হয়, আর জার্মানি যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় নিজস্ব শক্তি জোরালোভাবে দেখাতে পারেনি। ফলে অনেক ইউরোপীয় দেশ মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার নিচেই স্বস্তি খুঁজেছে।
বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি ও সমালোচনা
ফ্রান্সের সমালোচকেরা বলেন, কৌশলগত স্বাধীনতার কথা বললেও দেশটি নিজেই সামাজিক খাতে বিপুল ব্যয় করে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ধীর ছিল। প্রতি বছর প্রতিরক্ষার তুলনায় পেনশনে বহু গুণ বেশি খরচ করা হয়। এতে প্রশ্ন ওঠে—ঋণ নিয়ে পেনশন দিলে কৌশলগত স্বাধীনতা কতটা বাস্তবসম্মত?
এ ছাড়া “ইউরোপীয় পণ্য কিনুন” নীতিকে অনেক মিত্র দেশ ফরাসি সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির কৌশল হিসেবেও দেখে। ফলে ফ্রান্স যখন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর কথা বলে, অনেকের মনে সন্দেহ তৈরি হয়।
কূটনৈতিক ভঙ্গি নিয়েও অসন্তোষ
ফ্রান্স নিজেকে ইউরোপ ও ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ মিত্র মনে করলেও অন্যদের কাছে তাদের ভঙ্গি কখনও কখনও অহংকারী মনে হয়েছে। অতীতে সিদ্ধান্তে চাপ সৃষ্টি করতে বৈঠক বয়কট করা বা ইরাক যুদ্ধের সময় পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোকে তিরস্কার—এসব ঘটনা অনেকের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

তবু বাস্তবতা কি বদলাচ্ছে
ফ্রান্সের নীতিতে ভুলত্রুটি ছিল—এ কথা বিশ্লেষকেরাও মানেন। সাহেল অঞ্চলে প্রভাব হারানো কিংবা কিছু বাণিজ্য চুক্তিতে দ্বৈত অবস্থান তার উদাহরণ। তবুও ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের একাংশ এখন ফ্রান্সের যুক্তিকে নতুন করে ভাবছে।
তবে ইউরোপ একা চলার খরচ ও ঝুঁকি এখনও অনেককে শঙ্কিত করছে। কেউ আশা করছেন এই টানাপোড়েন সাময়িক, আবার কেউ মনে করছেন নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হওয়া জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















