জাপানের প্রতীকী চেরি ফুল বা সাকুরা দেখতে আগ্রহীদের এ বছর স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় এক সপ্তাহ আগে পরিকল্পনা করতে হতে পারে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস বলছে, বসন্তের শুরুতে তাপমাত্রা বেশি থাকায় সারা দেশে এবার সাকুরা গড়ে সময়ের আগেই ফুটতে পারে।
উষ্ণ বসন্তের প্রভাব
জাপান মেটিওরোলজিক্যাল করপোরেশনের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি মৌসুমে ফুল ফোটার সময় গড় সময়ের চেয়ে আগে আসবে। বিশেষ করে শুরুর বসন্তে তাপমাত্রা বৃদ্ধিই এ পরিবর্তনের মূল কারণ।
টোকিওতে সাকুরা ফুটতে পারে ১৮ মার্চের দিকে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ছয় দিন আগে। পূর্ণ প্রস্ফুটন হতে পারে ২৬ মার্চের মধ্যে। জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘সোমেই ইয়োশিনো’ জাতের চেরি ফুল সাধারণত পূর্ণ প্রস্ফুটনের এক সপ্তাহের মধ্যেই ঝরে যেতে শুরু করে।

প্রধান শহরগুলোর সম্ভাব্য সময়সূচি
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফুকুওকায় ১৮ মার্চ, কিয়োটোতে ২২ মার্চ এবং ওসাকায় ২৩ মার্চের দিকে ফুল ফোটা শুরু হতে পারে। পূর্ণ প্রস্ফুটন সাধারণত আট থেকে দশ দিনের মধ্যে ঘটে।
উত্তরাঞ্চলের শীতপ্রধান এলাকাগুলোতে সময় কিছুটা দেরিতে আসবে। সেনদাইয়ে ৪ এপ্রিল এবং সাপ্পোরোতে ২৫ এপ্রিলের দিকে ফুল ফোটার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেখানে ফুল ফোটার পর পূর্ণ প্রস্ফুটনে পৌঁছাতে সময় লাগে এক সপ্তাহেরও কম।
পূর্বাভাসের ভিত্তি ও মানদণ্ড
সরকারি আবহাওয়া সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসারে পূর্বাভাস তৈরি করা হয়। পাঁচ বা ছয়টি ফুল ফোটাকে ‘ফুল ফোটা শুরুর দিন’ ধরা হয়। আর যখন প্রায় ৮০ শতাংশ বা তার বেশি কুঁড়ি ফোটে, তখন তাকে ‘পূর্ণ প্রস্ফুটন’ বলা হয়। গত শরৎকাল থেকে তাপমাত্রার ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেসরকারি সংস্থার ভিন্ন পূর্বাভাস

ওয়েদার ম্যাপ নামের আরেক আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এ বছর পূর্ব জাপানে বিশেষভাবে আগেভাগে ফুল ফোটার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, টোকিওতে ১৬ মার্চেই সাকুরা ফোটা শুরু হতে পারে এবং ২৪ মার্চ পূর্ণ প্রস্ফুটন ঘটতে পারে। ওসাকা ও কিয়োটোতে ২১ থেকে ২২ মার্চের মধ্যে ফুল ফোটার সম্ভাবনা রয়েছে।
তারা জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং মার্চের শুরু পর্যন্ত তা উচ্চমাত্রায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে।
অন্যদিকে ওয়েদারনিউজ জানিয়েছে, পশ্চিম ও পূর্ব জাপানে স্বাভাবিক সময়েই ফুল ফোটার সম্ভাবনা বেশি, তবে উত্তর জাপানে তা গড় সময়ের আগেই হতে পারে। তাদের হিসাবে টোকিওতে ২২ মার্চ, ওসাকায় ২৮ মার্চ এবং সাপ্পোরোতে ২৬ এপ্রিল ফুল ফোটার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাপান আবহাওয়া সংস্থা জানায়, চলতি সপ্তাহে টোকিও অঞ্চলে বসন্তের প্রথম শক্তিশালী দমকা হাওয়া ‘হারু-ইচিবান’ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসের পূর্বাভাসে উত্তর জাপানে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ এবং পূর্ব ও পশ্চিম জাপানে ৬০ শতাংশ।

হানামি, পর্যটন ও পরিবেশগত চাপ
চেরি ফুল ফোটার সময় পরিবার ও বন্ধুরা গাছের নিচে বসে ‘হানামি’ নামে ঐতিহ্যবাহী ভোজের আয়োজন করে। বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এটি বড় আকর্ষণ। তবে জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে।
ফুজিওশিদা শহর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি জানিয়েছে, আরাকুরায়ামা সেঙ্গেন পার্কে এ বছর চেরি ব্লসম উৎসব আয়োজন করা হবে না। অতিরিক্ত পর্যটনের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিবেশ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ছে বলে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই স্থানটি প্যাগোডা ও সামনের সারিতে চেরি ফুলের দৃশ্যের সঙ্গে পেছনে মাউন্ট ফুজির মনোরম দৃশ্যের জন্য পরিচিত।
শহরের মেয়র শিগেরু হোরিউচি এক বিবৃতিতে বলেন, সুন্দর দৃশ্যের আড়ালে নাগরিকদের শান্ত জীবন হুমকির মুখে পড়ছে, যা গভীর উদ্বেগের কারণ।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সংরক্ষণ উদ্যোগ
চেরি ফুল মৌসুম জাপানের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে। ২০২৫ সালে এ মৌসুমের অর্থনৈতিক মূল্য ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ইয়েনের বেশি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ স্থানীয় সরকার চেরি গাছ রক্ষণাবেক্ষণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। পুরোনো গাছের পরিচর্যা ও পোকামাকড়ের আক্রমণ মোকাবিলা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চেরি ফুল সংরক্ষণ করতে হলে শুধু স্থানীয় প্রশাসন নয়, বাসিন্দা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















