পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বাড়ছে, ততই ভয়াবহ হয়ে উঠছে এক নীরব বিপদ। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বিশ্বজুড়ে জলাভূমি থেকে নির্গত মিথেন গ্যাসের পরিমাণ তেল ও গ্যাস শিল্পের চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের লড়াইয়ে তৈরি হচ্ছে এক বিপজ্জনক চক্র।
জলাভূমি কেন বড় উৎস
যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের এক জলাভূমিতে গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা নৌকা ঠেলে তুলতেই কাদার নিচ থেকে উঠে আসে গ্যাসের বুদবুদ। সেটিই মিথেন। জলমগ্ন, অক্সিজেনস্বল্প মাটিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া এই গ্যাস তৈরি করে। গরম বাড়লে তাদের কার্যক্রমও দ্রুত হয়, ফলে মিথেন নির্গমন বেড়ে যায়।
গবেষকদের হিসাব বলছে, বিশ্বজুড়ে জলাভূমি থেকে বছরে প্রায় ১৮ থেকে ৪০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন মিথেন নির্গত হচ্ছে। তুলনায় তেল, গ্যাস ও কয়লা শিল্প থেকে আসে প্রায় ১২০ থেকে ১৩৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অর্থাৎ প্রাকৃতিক উৎস এখন বড় উদ্বেগের কারণ।

কেন মিথেন এত ভয়ংকর
স্বল্পমেয়াদে মিথেন কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে প্রায় ৮০ গুণ বেশি শক্তিশালী উষ্ণায়নকারী গ্যাস। শিল্পবিপ্লবের পর বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রায় ৩০ শতাংশের জন্য দায়ী এই গ্যাস। ফলে এর উৎস, পরিমাণ ও আচরণ বোঝা এখন বিজ্ঞানীদের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।
ফ্লোরিডার এভারগ্লেডস অঞ্চলে দীর্ঘ ২৩ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জলাভূমি বছরে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করলেও একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মিথেন ছাড়ে। ফলে জলবায়ু উপকারের একটি বড় অংশ মিথেনের কারণে খর্ব হয়ে যায়।
লবণাক্ত বনাম মিঠা জলাভূমি
গবেষণায় দেখা গেছে, মিঠা পানির জলাভূমি সারা বছর ধীর গতিতে মিথেন ছাড়ে, গরমে বেশি, শীতে কম। কিন্তু লবণাক্ত জলাভূমিতে মিথেন নির্গমন তুলনামূলকভাবে কম। তাই উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবাহ বাড়ালে মিথেন কমানো সম্ভব হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হবে।

শিল্পখাতের নির্গমন কি কমছে
কিছু গবেষণা বলছে, গত দুই দশকে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের মিথেন নির্গমন স্থিতিশীল হয়েছে। তবে নতুন উপগ্রহ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আগের হিসাবের তুলনায় নির্গমন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। ফলে প্রকৃত চিত্র নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়ে গেছে।
১৫০টিরও বেশি দেশ ২০২০ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ মিথেন কমানোর অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতিতে প্রাকৃতিক উৎস, বিশেষ করে জলাভূমির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উপেক্ষা ভবিষ্যৎ জলবায়ু পূর্বাভাসকে ভুল পথে নিতে পারে।
উষ্ণায়নের বিপজ্জনক চক্র
তাপমাত্রা বাড়লে জলাভূমি থেকে মিথেন বাড়ে। আবার সেই মিথেন তাপমাত্রা আরও বাড়ায়। এভাবেই তৈরি হচ্ছে এক জলবায়ু চক্র, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলাভূমির পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ প্রয়োজন, তবে তার সঙ্গে মিথেন নির্গমন বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করা জরুরি।
পৃথিবী উষ্ণ হতে থাকলে জলাভূমির এই নীরব বিস্ফোরণই হতে পারে জলবায়ু সংকটের পরবর্তী বড় ধাক্কা।







সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















