ঊনবিংশ শতকের এক ঝড়ঝাপটা ভরা উপন্যাস আজও বারবার ফিরে আসে রূপালি পর্দায়। এমিলি ব্রন্টির লেখা ‘ওয়েদারিং হাইটস’ এমনই এক কাহিনি, যা যতবার চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছে, ততবারই নতুন বিতর্ক জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিকতম সংযোজন পরিচালক এমেরাল্ড ফেনেলের নির্মাণ, যেখানে মুখ্য ভূমিকায় মার্গট রবি ও জ্যাকব এলোরদি। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এই নতুন নির্মাণ কি উপন্যাসের আত্মাকে ধারণ করতে পেরেছে?

উপন্যাসের শক্তি ও অভিযোজনের চ্যালেঞ্জ
একটি বড় সাহিত্যকর্মের সার্থকতা শুধু পাঠ্যসূচিতে স্থান পাওয়ায় নয়, বরং কতবার তাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, তার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে। ‘ওয়েদারিং হাইটস’ সেই পরীক্ষায় বহুবার উত্তীর্ণ হয়েছে। ১৯২০ সালের ব্রিটিশ নির্বাক সংস্করণ থেকে শুরু করে জাপানি, ভারতীয় এমনকি ক্যালিফোর্নিয়ার প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মাণ—বিভিন্ন সংস্কৃতিতে গল্পটি নতুন রূপ পেয়েছে।
ক্যাথি ও হিথক্লিফের অস্থির প্রেম, প্রতিশোধ, সামাজিক বিভাজন এবং মৃত্যুর পরও না ফুরোনো সম্পর্ক—সব মিলিয়ে এটি নিছক রোম্যান্টিক কাহিনি নয়। বরং ভিক্টোরীয় সমাজব্যবস্থার কঠোরতা, মানুষের অন্ধকার আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগের বিপজ্জনক দিকও এতে সমানভাবে উপস্থিত।

স্মরণীয় কিছু সংস্করণ
১৯৩৯ সালে পরিচালক উইলিয়াম ওয়াইলারের নির্মাণ আজও অনেকের কাছে সেরা। মার্লে ওবেরন ও লরেন্স অলিভিয়ের অভিনয় চরিত্র দুটিকে এমন প্রাণ দিয়েছিল, যা পরবর্তী অনেক সংস্করণেও অনুপস্থিত। কাহিনির বড় অংশ বাদ গেলেও আবেগের গভীরতা অটুট ছিল।
১৯৯২ সালে পিটার কসমিনস্কির সংস্করণে জুলিয়েট বিনোশ ও রালফ ফাইনসের মতো তারকা থাকলেও নির্মাণে ছিল এক ধরনের স্থবিরতা। অন্যদিকে ২০০৯ সালের বিবিসি নির্মাণে টম হার্ডি ও শার্লট রাইলির রসায়ন দর্শকদের আকৃষ্ট করে।
২০১১ সালে আন্দ্রেয়া আর্নল্ডের নির্মাণে হিথক্লিফকে কৃষ্ণাঙ্গ চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা তার বহিরাগত অবস্থানকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে। ১৯৬৭ সালের বিবিসি ধারাবাহিকটি সাদাকালো সংস্করণে আজও ভৌতিক আবহ তৈরি করে। এই সংস্করণই গায়িকা কেট বুশকে অনুপ্রাণিত করেছিল বিখ্যাত গান রচনায়।
নতুন নির্মাণে কোথায় ঘাটতি
এমেরাল্ড ফেনেলের সংস্করণ নিজেকে নতুন ব্যাখ্যা হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকদের মতে, এতে উপন্যাসের বন্য, অন্ধকার সৌন্দর্য অনুপস্থিত। মার্গট রবি ও জ্যাকব এলোরদির রূপ ও উপস্থিতি নজর কেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা ও নিষ্ঠুরতার ছাপ স্পষ্ট নয়।
চলচ্চিত্রে গোপন মিলন ও নাটকীয় দৃশ্য থাকলেও আবেগের তীব্রতা অনেকটাই ম্লান। এমনকি উপন্যাসের বিতর্কিত ও ভৌতিক মুহূর্তগুলিও এখানে অনুপস্থিত। ফলে এটি অনেকের কাছে প্রিয় বইটির প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, বরং এক প্রকার বাহ্যিক উপস্থাপনায় সীমাবদ্ধ প্রচেষ্টা।

প্রেম, অন্ধকার ও চিরন্তন আকর্ষণ
‘ওয়েদারিং হাইটস’ একদিকে বিষণ্ন, অন্যদিকে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয়। এর মেঘলা পরিবেশের নিচে আছে বুনো সৌন্দর্য, যা যুগে যুগে নির্মাতাদের টেনেছে। প্রতিটি প্রজন্ম নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গল্পটিকে পুনর্গঠন করেছে।
নতুন সংস্করণ সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—উপন্যাসের আত্মা কি সত্যিই রূপালি পর্দায় ধরা পড়েছে, নাকি কেবল তার বাহ্যিক আভা?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















