বৈশ্বিক যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশে জ্বালানির কোনো সংকট তৈরি হয়নি বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলেও বাংলাদেশে তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল ছিল এবং এখনো রয়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মতো এলাকাও জ্বালানি সংকটে পড়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশে তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি দেখা দেয়নি।
গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সমুদ্রসীমা অর্জনের পরও সেখানে অনুসন্ধান কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি।
তার মতে, অতীতে সাফল্যের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বাপেক্সকে প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রাখা হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আমদানিনির্ভরতা কমাতে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে বাপেক্সের জন্য নতুন পাঁচটি রিগ সংগ্রহ এবং বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো হবে।
গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগে আন্তর্জাতিক কোম্পানির আগ্রহ প্রত্যাশা
সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে সমুদ্রসীমা থেকে গ্যাস উত্তোলন করে রপ্তানি করছে। তবে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা বাপেক্সের না থাকায় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে সম্প্রতি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এক মাস পর দরপত্র জমার সময়সীমা শেষ হলে আলোচনা সাপেক্ষে বিভিন্ন ব্লক বরাদ্দ দেওয়া হবে।
বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ
জ্বালানি আমদানির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে কাতার ও সৌদি আরবের সঙ্গে কিছু চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ফলে সরকারকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়েছে।
তিনি জানান, জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের তেল কেনা হয়েছে। যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে এবং তেলের কোনো সংকট তৈরি হয়নি।
আইপিপি বকেয়া নিয়ে চাপ
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, অতীতে উচ্চমূল্যে স্বাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হলেও তা ভোক্তাদের কাছে তুলনামূলক কম দামে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে ভর্তুকির বড় বোঝা সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার আইপিপি বকেয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এখন পুরোনো বকেয়ার পাশাপাশি চলমান বিলও পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে সরকার
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় দেশ ও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা তৈরি পোশাক শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের শর্তও দেওয়া হচ্ছে। ফলে রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সৌরবিদ্যুতের বিকল্প নেই।
দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য ব্যাটারি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ কারণে নতুন বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ব্যাটারির ওপর শুল্ক ও কর শূন্য করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে জনগণ এসব পদক্ষেপের বাস্তব ফল দেখতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ফ্লোরিডা জ্বালানি সংকট, বাংলাদেশে স্থিতিশীল তেল সরবরাহ
ফ্লোরিডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সংকট দেখা দিলেও বাংলাদেশে তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি হয়নি বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। একই সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান, বাপেক্স শক্তিশালীকরণ এবং সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাপেক্স সক্রিয়করণ, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন তিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















