সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিহীন আবহাওয়ার কারণে দেখা দিয়েছে তীব্র পানিসংকট। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বোরো ধান চাষিরা। সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেক ক্ষেতেই ধানের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে গেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত বৃষ্টি না হলে এবার বোরো উৎপাদন বড় ধাক্কা খেতে পারে।
বৃষ্টিহীন মৌসুমে শুকিয়ে যাচ্ছে ধানক্ষেত
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, প্রায় পাঁচ মাস ধরে এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। ফলে হাওর অঞ্চলের অধিকাংশ জমিতে সেচের পানি মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অনেক ক্ষেতেই পানির অভাবে ধানের চারা শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার খুশদার হাওর এলাকায় দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ জমিতে পানির সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উজানের কিছু এলাকায় খরার কারণে মাটিতে ফাটল ধরেছে। সেচের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকেরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
কৃষকের দুশ্চিন্তা বাড়ছে
বারাঘাট এলাকার কৃষক নাজির আলী জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ছয় কানি জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। কিন্তু পানির অভাবে এখন পুরো ফসল ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তার ভাষায়, মাটিতে ফাটল ধরেছে এবং ধানের গাছ লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। তিনি ভেবেছিলেন দ্রুত বৃষ্টি হবে, কিন্তু দীর্ঘদিনেও বৃষ্টি না হওয়ায় এখন বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। তার মতো হাওর অঞ্চলের অনেক কৃষক একই সংকটে রয়েছেন।
স্থানীয় কৃষকেরা আরও অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি আগেভাগেই কয়েকটি জলাশয়ের পানি সরিয়ে ফেলেছে। ফলে সেচের জন্য পানির সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পানিসংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় কৃষকদের উদ্বেগ বাড়ছে।

উৎপাদন লক্ষ্য পূরণ নিয়ে শঙ্কা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় চলতি মৌসুমে দুই লক্ষ তেইশ হাজার পাঁচশ পাঁচ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাস্তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কিছু বেশি জমিতে চাষ হয়েছে।
এই মৌসুমে প্রায় চৌদ্দ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হলেও চলমান খরা পরিস্থিতি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক বলেন, চলতি বছরে বোরো মৌসুমে এখনো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত দেখা যায়নি, যা আগের বছরের তুলনায় অস্বাভাবিক। অনেক হাওর এলাকায় সেচ সংকট তৈরি হয়েছে এবং ধানের গাছ খরার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে পোকামাকড়ের আক্রমণও বাড়তে পারে।

তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সপ্তাহের শেষের দিকে বৃষ্টি হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে এবং ফসলও আংশিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
গ্রামীণ জীবনে বাড়ছে সংকট
দীর্ঘদিনের শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও। খাল ও জমি শুকিয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় ঘাস ঠিকমতো জন্মাচ্ছে না। ফলে গবাদিপশুর খাদ্যের সংকট তৈরি হয়েছে।
এতে পশুপালনকারীরাও নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। ফলে সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের গ্রামীণ জীবনে ধীরে ধীরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















