সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় চাকা ও প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশের তীব্র সংকটে প্রায় ২০০টি রেলকোচ দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। সামনে ঈদের ভ্রমণ মৌসুম ঘনিয়ে আসায় এই পরিস্থিতি ট্রেন চলাচলে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারখানা সূত্র জানায়, অচল হয়ে থাকা কোচগুলোর মধ্যে শতাধিক কোচে শুধু নতুন চাকা লাগালেই সেগুলো আবার চালু করা সম্ভব। কিন্তু কয়েক মাস ধরে নতুন চাকার কোনো সরবরাহ না থাকায় মেরামতের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না।
ঢাকামুখী আন্তনগর ট্রেনের কোচ বেশি
অচল কোচগুলোর বেশিরভাগই ব্রডগেজ বগি, যা মূলত ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেনগুলোতে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই কোচগুলো চালু না হলে ঈদে যাত্রীচাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এছাড়া আরও প্রায় একশটি কোচ বিভিন্ন ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ খুচরা যন্ত্রাংশের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে মেরামতহীন অবস্থায় রয়েছে। ফলে সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটিও এসব কোচকে অচল করে দিচ্ছে।

ঈদে যাত্রীচাপে সংকটের আশঙ্কা
ঈদের সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাখো মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করেন। এমন সময়ে পর্যাপ্ত কোচের অভাব দেখা দিলে ট্রেনে অতিরিক্ত ভিড় এবং যাত্রাবিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রেলওয়ের সূত্র জানায়, প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন আন্তনগর রুটে চলাচলের সময় ত্রুটি দেখা দিলে প্রায় ২০০টি কোচ মেরামতের জন্য সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় পাঠানো হয়। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি কোচে শুধু চাকা বদলালেই চলাচলের উপযোগী হয়ে ওঠে। বাকি কোচগুলো বিভিন্ন যন্ত্রাংশের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে মেরামতের অপেক্ষায় থাকে।
বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানিতে স্থবিরতা
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, স্প্রিং, বিয়ারিং, পিক আয়রন এবং হার্ড ক্লকের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সাধারণত বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে এসব যন্ত্রাংশ আমদানি বন্ধ থাকায় সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
রেলওয়ের যন্ত্রাংশ আমদানির প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে বলেও তারা জানিয়েছেন।

একই সময়ে আমদানি হওয়ায় একসঙ্গে সমস্যা
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, অচল হয়ে থাকা অনেক কোচ ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে একই সময়ের কাছাকাছি সময়ে আমদানি করা হয়েছিল। ফলে নির্দিষ্ট সময় পর অনেক কোচেই একসঙ্গে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে।
এছাড়া এসব কোচের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থাকা সার্ভিস চুক্তির মেয়াদও ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ফলে এখন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে।
এর কারণে কোচ মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আলাদাভাবে আমদানি করতে হচ্ছে, যা সম্পন্ন হতে অন্তত আরও এক বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কারিগরি সক্ষমতা থাকলেও কাজ থমকে
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ জানান, কারখানার কারিগরি সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে মেরামতের কাজ পুরোপুরি চালানো যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও এই কারখানায় প্রতি দুই দিনে তিনটি যাত্রীবাহী কোচ ও তিনটি মালবাহী ওয়াগন মেরামত করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বিদেশি যন্ত্রাংশের অভাবে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তার মতে, প্রত্যাশিত উৎপাদন দিতে না পারায় রেলওয়ে আর্থিকভাবেও ক্ষতির মুখে পড়ছে।
সমাধানে আগাম মজুতের ওপর জোর
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত খুচরা যন্ত্রাংশ আগাম মজুত রাখা এবং ক্রয় প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। এতে মেরামতের কাজ বাধাহীনভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, রেল ভবন, মন্ত্রণালয় এবং সরকার দ্রুত এই সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
তবে স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এমন যন্ত্রাংশ দিয়ে যে ধরনের মেরামত সম্ভব, সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















