আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার হঠাৎ পদত্যাগ করায় নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ। অভিযোগটি সামনে আসার কিছুক্ষণ পরই প্রকাশ্যে আসে দুটি কথিত অডিও, যেখানে একটি মামলায় খালাসের বিনিময়ে বিপুল অর্থ দাবি করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ঘটনাটি প্রকাশের পর থেকেই বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
কোটি টাকার দরকষাকষির অভিযোগ
প্রকাশ্যে আসা অডিওতে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথোপকথনের সময় একটি মামলার অভিযুক্তকে খালাস করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এক কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কথোপকথনে অর্থ পরিশোধের বিষয়টি ধাপে ধাপে বা কিস্তিতে দেওয়ার প্রস্তাবের কথাও উঠে এসেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মামলার বিষয়টি সহজ করার জন্য রাজনৈতিক তদবিরের কথাও আলোচনায় এসেছে। নতুন প্রধান প্রসিকিউটরকে তুলনামূলক সহনশীল হিসেবে উল্লেখ করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে যোগাযোগ করার কথাও বলা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
আইনজীবীর রহস্যময় প্রতিক্রিয়া
এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাবেক সংসদ সদস্যের পরিবারের আইনজীবী রেজওয়ানা ইউসুফের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে রাজি হননি। তবে ঘুষ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নেও তিনি সরাসরি অস্বীকার করেননি।
অডিওর সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এত বড় ঘটনার ক্ষেত্রে কিছুটা সত্য থাকার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার এই মন্তব্য নতুন করে কৌতূহল ও বিতর্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার সাবেক প্রসিকিউটরের
অন্যদিকে মো. সাইমুম রেজা তালুকদার তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং প্রকাশিত অডিও ক্লিপগুলোর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, একটি মামলায় কোনো প্রসিকিউটরের একক সিদ্ধান্তে কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন টিমের যৌথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মামলাগুলো আদালতে উপস্থাপন করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত আদালতই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেন।
পদত্যাগ নিয়ে তার ব্যাখ্যা
পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, অনেকদিন ধরেই তিনি আগের কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। গবেষণা ও লেখালেখিতে মনোযোগ দেওয়া এবং পরিবারকে সময় দেওয়ার জন্যই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেন।
তার মতে, নতুন নেতৃত্বের অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।
অডিও নিয়ে ফরেনসিক প্রশ্ন
এদিকে ফাঁস হওয়া অডিওগুলোর সত্যতা নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি। ফলে চূড়ান্তভাবে কিছু বলার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর ও সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, কথোপকথনের শ্বাসপ্রশ্বাস ও বাচনভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে হচ্ছে। তবে কণ্ঠস্বরের নমুনা, কল তথ্য ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে অডিওটি কার এবং কী উদ্দেশ্যে এটি প্রকাশ করা হয়েছে।
মামলার পটভূমি
চট্টগ্রামে ছাত্র আন্দোলনের সময় কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যার ঘটনায় এক সাবেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার সহিংসতায় কয়েকজন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরবর্তীতে ওই সাবেক সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এই মামলাকে কেন্দ্র করেই এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ এবং ফাঁস হওয়া অডিও নিয়ে বিতর্ক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















