মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে সমুদ্র ড্রোন ব্যবহার করে হামলার ঘটনা বাড়ছে। সাম্প্রতিক দুটি হামলার ঘটনায় নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দিয়েছেন সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে উত্তেজনা আরও বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিস্ফোরক বহনকারী মানববিহীন সমুদ্রযান বা নৌ ড্রোন এখন বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
উপসাগরে ড্রোন হামলার নতুন ধারা
সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ ও বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত দুটি তেলবাহী জাহাজে সমুদ্র ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিস্ফোরকবাহী এই মানববিহীন নৌযানগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে আগেও ব্যবহৃত হয়েছে। ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে এমন ড্রোন ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল। এখন একই প্রযুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এর মধ্যেই ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
ওমান উপকূলে প্রথম হামলা
১ মার্চ ওমানের উপকূল থেকে প্রায় ৪৪ নটিক্যাল মাইল দূরে এমকেডি ভিওম নামের একটি তেলবাহী জাহাজে প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে। ব্রিটেনের সামুদ্রিক সংস্থা জানায়, এই হামলায় একজন নাবিক নিহত হন।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থা জানিয়েছে, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী ওই জাহাজে পানির সমতলের ঠিক উপরে একটি মানববিহীন সমুদ্রযান আঘাত হানে। এতে জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষে বিস্ফোরণ ও আগুন লাগে।
ইরাকের কাছে দ্বিতীয় হামলা
এর কয়েক দিন পর আরেকটি ঘটনা ঘটে ইরাকের খোর আল জুবায়ের বন্দরের কাছে। সেখানে নোঙর করা বাহামা পতাকাবাহী সোনানগোল নামিবে নামের একটি তেলবাহী জাহাজে একটি ছোট নৌযান আঘাত করে।
জাহাজ পরিচালনাকারী সোনানগোল মেরিন সার্ভিসেস জানায়, জাহাজের ২৩ জন নাবিক নিরাপদ আছেন। তবে তদন্ত চলায় কী ধরনের নৌযান হামলায় ব্যবহার হয়েছে সে বিষয়ে তারা মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ছোট স্পিডবোটের মতো একটি বস্তু দ্রুতগতিতে জাহাজের দিকে ছুটে গিয়ে ধাক্কা দেয়। এরপরই বড় বিস্ফোরণ ঘটে এবং আকাশে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়।
ব্রিটেনভিত্তিক দুই সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞের মতে, ভিডিওতে দেখা বস্তুটি সম্ভবত একটি নৌ ড্রোন, যা আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়।
ইরানের সম্পৃক্ততার সন্দেহ
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একজন রবার্ট পিটার্স মনে করেন, সোনানগোল নামিবে জাহাজে হামলার পেছনে ইরানের হাত থাকতে পারে। তার মতে, ইরান আগেও সামরিক প্রদর্শনীতে নৌ ড্রোনের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
তিনি বলেন, হামলার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর একদিন আগে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছিল যে তারা উত্তর পারস্য উপসাগরে একটি মার্কিন তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে রয়টার্স এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি এই দুই হামলার জন্য কে দায়ী। জাতিসংঘে ইরানের মিশন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্যও করেনি।

সমুদ্র ড্রোনের বড় ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্র ড্রোন আকাশপথের ড্রোনের তুলনায় বেশি বিস্ফোরক বহন করতে পারে। কখনও কখনও এর ক্ষমতা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরক শক্তির কাছাকাছি হতে পারে।
আকাশ ড্রোন ওপর থেকে হামলা চালিয়ে নাবিকদের ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু সমুদ্র ড্রোন জাহাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশে আঘাত করলে পুরো জাহাজ অচল হয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি জাহাজ যদি অচল হয়ে পড়ে, তবে পরবর্তী হামলার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় এবং তখন জাহাজটি অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় পড়ে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















