যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে চালু হওয়া ১০০ কোটি ডলারের নতুন শিক্ষা ভাউচার কর্মসূচি থেকে প্রায় দুই ডজন ইসলামি স্কুলকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সন্ত্রাসী সংগঠনের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের দাবি, এটি স্পষ্ট ধর্মীয় বৈষম্য। অন্যদিকে রাজ্য প্রশাসন বলছে, করদাতাদের অর্থ যেন কোনোভাবে সন্ত্রাসবাদ বা বিদেশি প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ভাউচার কর্মসূচি ও বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত
টেক্সাসের নতুন শিক্ষা ভাউচার কর্মসূচি আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু হওয়ার কথা। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য পরিবারগুলোকে ১০,৪৭৪ ডলার পর্যন্ত দেওয়া হবে, যা তারা বেসরকারি স্কুলের টিউশন ফি বা অন্যান্য শিক্ষা খরচে ব্যবহার করতে পারবে।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ডলার পর্যন্ত সহায়তা পেতে পারে। আর যেসব শিক্ষার্থী বাড়িতে পড়াশোনা করে, তারা প্রায় ২ হাজার ডলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
তবে রাজ্যের কম্পট্রোলার কার্যালয় প্রায় দুই ডজন ইসলামি স্কুলকে এই কর্মসূচি থেকে বাদ দিয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, এসব স্কুলে কখনও কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) নামের একটি মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠনের আয়োজিত অনুষ্ঠান হয়েছে।
গত বছরের নভেম্বর মাসে টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট কেয়ারকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেন। এর পরই এসব স্কুলকে কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কেয়ারের প্রতিক্রিয়া
কেয়ার বরাবরই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। সংগঠনটির অস্টিন শাখার অপারেশনস ম্যানেজার শাইমা যায়ান বলেন, অনেক স্কুলের সঙ্গে কেয়ারের কোনো সম্পর্কই নেই, তবুও তাদেরও নিষিদ্ধ তালিকায় রাখা হয়েছে।
তার ভাষায়, এটি মূলত সব মুসলিম স্কুলের বিরুদ্ধে বৈষম্য করার একটি অজুহাত মাত্র।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে যেসব পরিবার তাদের সন্তানদের ওই স্কুলগুলোতে পড়াতে চায়, তারা হাজার হাজার ডলারের সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবে।
প্রশাসনের অবস্থান
টেক্সাসের ভারপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার কেলি হ্যানকক বলেন, করদাতাদের অর্থ যেন কোনো বিদেশি শত্রু রাষ্ট্র, সন্ত্রাসী সংগঠন বা আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে জানতে চান, এমন কিছু স্কুলকে কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া যায় কি না যাদের বিদেশি প্রভাব বা অন্য কোনো ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন পরে নিশ্চিত করেন, কম্পট্রোলারের এই ধরনের স্কুলকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
তবে সমালোচকদের দাবি, প্রশাসনের চিঠিতে স্কুলগুলোর বিরুদ্ধে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

ভাউচার কর্মসূচির বিস্তার
মার্চের শুরু পর্যন্ত টেক্সাসের এই ভাউচার কর্মসূচিতে ইতিমধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী নাম লিখিয়েছে। অনুমোদন পেয়েছে ২,২০৮টি স্কুল।
এসবের মধ্যে মন্টেসরি, খ্রিস্টান ও ইহুদি বেসরকারি স্কুলও রয়েছে।
তবে প্রায় ১০০টি স্কুলকে কর্মসূচিতে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এর মধ্যে অন্তত ২৩টি স্বীকৃত ইসলামি বেসরকারি স্কুল রয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলা ও আইনি লড়াই
হিউস্টন এলাকার এক অভিভাবক ও আইনজীবী মেহদি শেরকাউই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন।
তার দুই সন্তান, যাদের বয়স ৬ ও ৮ বছর, একটি ইসলামি বেসরকারি স্কুলে পড়ে। সেই স্কুলটিও অনুমোদিত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
শেরকাউই বলেন, তিনি মরক্কোতে বেড়ে ওঠার সময় যে মূল্যবোধে বড় হয়েছেন, সেই একই নীতিতে সন্তানদের বড় করতে চান। সে কারণেই তিনি তাদের ইসলামি স্কুলে পড়ান।
বর্তমানে দুই সন্তানের জন্য বছরে প্রায় ১৭,৯১০ ডলার টিউশন দিতে হয় তাকে। ভাউচার কর্মসূচি চালু হলে তিনি বছরে ২০ হাজার ডলারের বেশি সরকারি সহায়তা পেতে পারতেন, যা পুরো টিউশন ফি কভার করত।
তার মতে, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক নাগরিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
রাজনৈতিক পরিবেশ ও বিতর্ক
এই বিতর্ক এমন সময়ে সামনে এসেছে যখন টেক্সাসে প্রাইমারি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা চলছে এবং মুসলিমবিরোধী বক্তব্যও বেড়েছে।
মার্চের ১ তারিখ অস্টিনের একটি বারে গুলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ “চরমপন্থী ইসলাম”-এর প্রসঙ্গ তুলেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
শেরকাউই বলেন, রাজনৈতিক সুবিধার জন্য মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রায়ই লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

ফ্লোরিডায় একই ধরনের উদ্যোগ
টেক্সাসের পাশাপাশি ফ্লোরিডাতেও একই ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস ডিসেম্বর মাসে একটি নির্বাহী আদেশে কেয়ারকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে একটি ফেডারেল আদালত সম্প্রতি সেই আদেশ স্থগিত করেছে।
এদিকে ফ্লোরিডার আইনসভায় একটি বিল পাস হয়েছে, যাতে কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে কোনো সংগঠনকে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করার ক্ষমতা দেওয়া হবে। সেই সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে স্কুলগুলোও ভাউচার তহবিল পাবে না।
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা সতর্ক করেছেন, এই আইন বৈষম্যের পথ খুলে দিতে পারে এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, টেক্সাস ও ফ্লোরিডার এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রে ভবিষ্যতে ইসলামি স্কুলগুলোর অবস্থানের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কারণ আগামী বছর দেশটির প্রথম ফেডারেল ভাউচার কর্মসূচি চালু হওয়ার কথা রয়েছে। সেই কর্মসূচির আওতায় নাগরিকরা শিক্ষা তহবিলে অনুদান দিলে শতভাগ করছাড় পাবেন।
২০২৭ সালে কার্যকর হওয়া এই কর্মসূচির ব্যয় আগামী দশ বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসলামিক স্কুলস লিগ অব আমেরিকার নির্বাহী পরিচালক শাজা খান বলেন, মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই নিজেদের ওপর চাপ অনুভব করছে।
তার মতে, প্রশাসনের কিছু নীতির কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে ভবিষ্যতের শিক্ষা কর্মসূচিগুলোতেও তাদের বাদ দেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে কিছু রক্ষণশীল বিশ্লেষক বলছেন, ভাউচার কর্মসূচি সব ধর্মের জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত, তবে এমন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকা দরকার যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ জড়িত থাকতে পারে।
তাদের মতে, যদি কোনো স্কুল রাজ্যের নীতিমালা লঙ্ঘন করে বা শত্রু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে সেসব প্রতিষ্ঠানে করদাতাদের অর্থ না যাওয়াই স্বাভাবিক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















