০৩:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
চীনের শিল্পনীতি এখন বিশ্বমুখী, মুক্তবাজারের দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ সফরে আসছেন চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েইদং দেশে আবার কমল সোনার দাম, ভরিতে কমেছে ৩,৩২৪ টাকা হংকংয়ের সিং মা সেতুতে বহুগাড়ির সংঘর্ষে আহত ১০, বিমানবন্দরমুখী যান চলাচল ব্যাহত বাজার স্থিতিশীল রাখতে ছুটির দিনেও জ্বালানি সরবরাহ চালু রাখবে বিপিসি দক্ষিণ চীন সাগরে ১০ বছর পর আবার দ্বীপ নির্মাণে সক্রিয় বেইজিং? চীনের পাঁচ বছরের বিমান পরিকল্পনা: সি৯১৯ উৎপাদন বাড়ানো, নতুন ইঞ্জিন ও বিদেশি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় বাণিজ্যপথে সংকট, বিকল্প রুট খুঁজতে ব্যস্ত চীনের লজিস্টিকস খাত ইরানে বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনা, ক্ষোভে ফুঁসছে ইরানিরা ইরান-উত্তর কোরিয়ার আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সহযোগিতার সম্ভাবনা

ইরানে যুদ্ধের দুই সপ্তাহ, শেষ কোথায়?

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। তীব্র হামলা ও পাল্টা হামলার মধ্যেও এখনো যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। চীনা বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম, আর এই সংঘাতে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে উঠতে পারে ইসরায়েল।

যুদ্ধের দুই সপ্তাহ: পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়িয়েছে
ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ বিমান হামলা শুরু করার পর থেকেই সংঘাত দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ওই হামলায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।

এই সংঘাত ইতিমধ্যে গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়সীমাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। তেহরানের দাবি অনুযায়ী বর্তমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১,৩০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, প্রায় ১৪০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন এবং অন্তত সাতজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।

Did Trump approve Israel's attack on Iran, and is the US preparing for war?  | US-Israel war on Iran News | Al Jazeera

সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চলে
যুদ্ধ শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় কিছু বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ইরানের ঘনিষ্ঠ শিয়া গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতির কারণে ইরাক ও লেবানন এখন কার্যত প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে অভিযান বাড়িয়েছে। একই সময় ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলো মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে।

প্রতিবেশী দেশকে নয়, মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য: ইরানের স্পষ্টবার্তা

দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম
বেইজিংয়ের ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশল কেন্দ্রের গবেষক জোডি ওয়েন মনে করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান দ্রুত আলোচনায় না ফিরলে অন্তত আরও কয়েক সপ্তাহ সংঘাত চলতে পারে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিল, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের ধারণার চেয়ে জটিল হয়ে উঠেছে। ইরানের পাল্টা হামলার তীব্রতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তবে ওয়েন মনে করেন, এত তীব্র সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রাখা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা কমাতে চাইতে পারে।

ইসরায়েলই বড় অনিশ্চয়তা
ওয়েনের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হয়তো উত্তেজনা কমাতে চাইবে, কিন্তু ইসরায়েল সংঘাতকে আরও উসকে দিতে পারে।

ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের উপপরিচালক ঝাং চুচুও একই মত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানকে দুর্বল করার লক্ষ্য থেকে সরে আসতে এখনো প্রস্তুত নন।

এর ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠিন অবস্থায় পড়েছেন। তিনি যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে চাইলে সেটি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না।

Chuchu Zhang - AGSI

আলোচনার পথও সংকীর্ণ
ঝাং বলেন, আগে পারমাণবিক আলোচনায় ইরান কিছু বিষয়ে আপসের ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলা আলোচনার ভিত্তি নষ্ট করে দিয়েছে।

হামলার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছিল এবং ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত না করার বিষয়ে সম্মত হচ্ছিল। কিন্তু তার কিছু সময় পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হয়।

ইসরায়েলের অবস্থান
ইসরায়েল দাবি করেছে তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চায় না। তবে তারা বলেছে, পরিস্থিতি “উপযুক্ত” মনে না হওয়া পর্যন্ত অভিযান বন্ধ হবে না।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা’আর বলেছেন, তাদের লক্ষ্য অনন্তকাল যুদ্ধ চালানো নয়। তবে যখন তারা ও তাদের মিত্ররা মনে করবে যুদ্ধ থামানোর সময় এসেছে, তখনই অভিযান বন্ধ করা হবে।

সফর রেখে পালিয়েছেন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ট্রাম্পের অবস্থান এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ
বেইজিংভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক ঝৌ রং মনে করেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে তা অনেকটাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

তার মতে, ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি হামলা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং দেশের শক্তিও ক্ষয় করতে পারে—এটি ট্রাম্প এখন নতুন করে হিসাব করছেন।

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ নিউ শিনছুন বলেন, ট্রাম্প চাইলে যেকোনো সময় “বিজয়” ঘোষণা করে যুদ্ধ শেষ করতে পারেন। কিন্তু এতে মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে।

তার মতে, যদি যুদ্ধের খরচ—আঞ্চলিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক বোঝা—খুব বেশি হয়ে যায়, তাহলে ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারেন। তবে সেই সমাপ্তি হবে কেবল বাহ্যিক, প্রকৃত সংকট রয়ে যাবে।

ইসরাইল-ইরান সংঘাতে ট্রাম্পের অবস্থান 'ঝুঁকিপূর্ণ পথে' - The Bangladesh Today

হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে “আক্রমণকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট” জাহাজ চলাচলে কার্যত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

মাত্র ৩৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল পরিবহন হয়। পাশাপাশি এখান দিয়ে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারও পরিবহন করা হয়।

এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম বেড়ে গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে বিপদে ফেলতে পারে। সামনে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনও রয়েছে।

প্রণালি বন্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না
ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝাং মনে করেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। কারণ এতে সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তার মতে, ইরান যদি পুরোপুরি এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে নিজের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ক্ষতি হবে।

চীনের অবস্থান
চীন ইতোমধ্যে সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, সামরিক অভিযান বন্ধ করে উত্তেজনা বাড়ানো এড়াতে হবে এবং আঞ্চলিক সংকট যাতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত না করে তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির সংকট যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকেও বড় ধাক্কা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে উপসাগরীয় তেল উৎপাদক দেশ এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় আমদানিকারক রাষ্ট্র।

আগুনে ঘি ঢালছেন ট্রাম্প: চীন

যুদ্ধের শেষ কে নির্ধারণ করবে
ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শে গ্যাংঝেং বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের তুলনায় মিত্র দেশগুলোর ক্ষতি বেশি হতে পারে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়বে।

তার মতে, ইরান এবার যুদ্ধের সমাপ্তি নিজেদের শর্তে নির্ধারণ করতে চাইবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি তাদের অবিশ্বাস এখন আরও গভীর।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসও একই ধরনের বার্তা দিয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নায়িনি বলেছেন, যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা ইরানই নির্ধারণ করবে; যুক্তরাষ্ট্র নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের শিল্পনীতি এখন বিশ্বমুখী, মুক্তবাজারের দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ

ইরানে যুদ্ধের দুই সপ্তাহ, শেষ কোথায়?

০২:০৫:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। তীব্র হামলা ও পাল্টা হামলার মধ্যেও এখনো যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। চীনা বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম, আর এই সংঘাতে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে উঠতে পারে ইসরায়েল।

যুদ্ধের দুই সপ্তাহ: পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়িয়েছে
ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ বিমান হামলা শুরু করার পর থেকেই সংঘাত দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ওই হামলায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।

এই সংঘাত ইতিমধ্যে গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়সীমাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। তেহরানের দাবি অনুযায়ী বর্তমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১,৩০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, প্রায় ১৪০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন এবং অন্তত সাতজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।

Did Trump approve Israel's attack on Iran, and is the US preparing for war?  | US-Israel war on Iran News | Al Jazeera

সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চলে
যুদ্ধ শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় কিছু বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ইরানের ঘনিষ্ঠ শিয়া গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতির কারণে ইরাক ও লেবানন এখন কার্যত প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে অভিযান বাড়িয়েছে। একই সময় ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলো মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে।

প্রতিবেশী দেশকে নয়, মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য: ইরানের স্পষ্টবার্তা

দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম
বেইজিংয়ের ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশল কেন্দ্রের গবেষক জোডি ওয়েন মনে করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান দ্রুত আলোচনায় না ফিরলে অন্তত আরও কয়েক সপ্তাহ সংঘাত চলতে পারে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিল, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের ধারণার চেয়ে জটিল হয়ে উঠেছে। ইরানের পাল্টা হামলার তীব্রতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তবে ওয়েন মনে করেন, এত তীব্র সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রাখা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা কমাতে চাইতে পারে।

ইসরায়েলই বড় অনিশ্চয়তা
ওয়েনের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হয়তো উত্তেজনা কমাতে চাইবে, কিন্তু ইসরায়েল সংঘাতকে আরও উসকে দিতে পারে।

ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের উপপরিচালক ঝাং চুচুও একই মত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানকে দুর্বল করার লক্ষ্য থেকে সরে আসতে এখনো প্রস্তুত নন।

এর ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠিন অবস্থায় পড়েছেন। তিনি যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে চাইলে সেটি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না।

Chuchu Zhang - AGSI

আলোচনার পথও সংকীর্ণ
ঝাং বলেন, আগে পারমাণবিক আলোচনায় ইরান কিছু বিষয়ে আপসের ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলা আলোচনার ভিত্তি নষ্ট করে দিয়েছে।

হামলার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছিল এবং ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত না করার বিষয়ে সম্মত হচ্ছিল। কিন্তু তার কিছু সময় পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হয়।

ইসরায়েলের অবস্থান
ইসরায়েল দাবি করেছে তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চায় না। তবে তারা বলেছে, পরিস্থিতি “উপযুক্ত” মনে না হওয়া পর্যন্ত অভিযান বন্ধ হবে না।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা’আর বলেছেন, তাদের লক্ষ্য অনন্তকাল যুদ্ধ চালানো নয়। তবে যখন তারা ও তাদের মিত্ররা মনে করবে যুদ্ধ থামানোর সময় এসেছে, তখনই অভিযান বন্ধ করা হবে।

সফর রেখে পালিয়েছেন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ট্রাম্পের অবস্থান এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ
বেইজিংভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক ঝৌ রং মনে করেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে তা অনেকটাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

তার মতে, ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি হামলা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং দেশের শক্তিও ক্ষয় করতে পারে—এটি ট্রাম্প এখন নতুন করে হিসাব করছেন।

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ নিউ শিনছুন বলেন, ট্রাম্প চাইলে যেকোনো সময় “বিজয়” ঘোষণা করে যুদ্ধ শেষ করতে পারেন। কিন্তু এতে মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে।

তার মতে, যদি যুদ্ধের খরচ—আঞ্চলিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক বোঝা—খুব বেশি হয়ে যায়, তাহলে ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারেন। তবে সেই সমাপ্তি হবে কেবল বাহ্যিক, প্রকৃত সংকট রয়ে যাবে।

ইসরাইল-ইরান সংঘাতে ট্রাম্পের অবস্থান 'ঝুঁকিপূর্ণ পথে' - The Bangladesh Today

হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে “আক্রমণকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট” জাহাজ চলাচলে কার্যত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

মাত্র ৩৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল পরিবহন হয়। পাশাপাশি এখান দিয়ে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারও পরিবহন করা হয়।

এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম বেড়ে গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে বিপদে ফেলতে পারে। সামনে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনও রয়েছে।

প্রণালি বন্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না
ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝাং মনে করেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। কারণ এতে সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তার মতে, ইরান যদি পুরোপুরি এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে নিজের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ক্ষতি হবে।

চীনের অবস্থান
চীন ইতোমধ্যে সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, সামরিক অভিযান বন্ধ করে উত্তেজনা বাড়ানো এড়াতে হবে এবং আঞ্চলিক সংকট যাতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত না করে তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির সংকট যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকেও বড় ধাক্কা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে উপসাগরীয় তেল উৎপাদক দেশ এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় আমদানিকারক রাষ্ট্র।

আগুনে ঘি ঢালছেন ট্রাম্প: চীন

যুদ্ধের শেষ কে নির্ধারণ করবে
ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শে গ্যাংঝেং বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের তুলনায় মিত্র দেশগুলোর ক্ষতি বেশি হতে পারে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়বে।

তার মতে, ইরান এবার যুদ্ধের সমাপ্তি নিজেদের শর্তে নির্ধারণ করতে চাইবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি তাদের অবিশ্বাস এখন আরও গভীর।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসও একই ধরনের বার্তা দিয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নায়িনি বলেছেন, যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা ইরানই নির্ধারণ করবে; যুক্তরাষ্ট্র নয়।