ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে নতুন পারমাণবিক প্রতিরোধ কৌশল ঘোষণা করেছে ফ্রান্স। দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ জানিয়েছেন, ফ্রান্স তার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াবে এবং একই সঙ্গে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে যৌথ নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে তুলবে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু ফ্রান্স নয়, বরং ইউরোপের ঘনিষ্ঠ মিত্রদেরও সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
ব্রিটানির নৌঘাঁটি থেকে শক্তির বার্তা
মার্চের শুরুতে ব্রিটানির ইল লং দ্বীপের উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত নৌঘাঁটিতে গিয়ে বক্তব্য দেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধবিমান দ্বারা নিরাপত্তা বেষ্টিত এই সফরে তিনি একটি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিনের সামনে দাঁড়িয়ে দেশের নতুন প্রতিরক্ষা নীতি তুলে ধরেন।
মাক্রোঁ জানান, ফ্রান্স তার পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। বর্তমানে দেশটির কাছে প্রায় দুইশ নব্বইটি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। পশ্চিম ইউরোপে আরেকটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ব্রিটেনের তুলনায় এটি সামান্য বেশি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারের তুলনায় অনেক কম।
ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে “কঠোর পর্যাপ্ততা” নীতি অনুসরণ করে এসেছে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে ভয়াবহ ক্ষতি করার মতো যথেষ্ট অস্ত্রই তাদের কাছে থাকবে। তবে এবার অস্ত্রভাণ্ডার বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অস্ত্র প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা উচিত নয় বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। বরং যে কোনো সম্ভাব্য শত্রুকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চান যে ফ্রান্সের ওপর হামলা হলে তার জবাব হবে ভয়াবহ।

নতুন ‘অগ্রবর্তী প্রতিরোধ’ নীতি
ফ্রান্স এবার ইউরোপের সাতটি অ-পরমাণু রাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন এক প্রতিরোধ সহযোগিতা গড়ে তুলছে। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, জার্মানি, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও সুইডেন।
এই সহযোগিতা ব্যবস্থাকে ফ্রান্স “অগ্রবর্তী প্রতিরোধ” হিসেবে বর্ণনা করছে। এর অধীনে যৌথ সামরিক মহড়া হবে এবং ফ্রান্সের পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন বিমানবাহিনীর সঙ্গে অন্যান্য দেশ প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে অংশ নেবে। ফ্রান্স বছরে চারবার এমন মহড়া পরিচালনা করে থাকে।
কখনো কখনো ইউরোপের অন্য দেশেও পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পন্ন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হতে পারে, যদিও অন্য দেশে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র রাখার কোনো পরিকল্পনা নেই।
ইউরোপীয় সংহতির বার্তা
ফ্রান্সের একজন কূটনীতিকের মতে, এই উদ্যোগ ইউরোপীয় ঐক্যের শক্ত বার্তা দেবে এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের হিসাব-নিকাশ আরও জটিল করে তুলবে। ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলিও চাইলে এই উদ্যোগে যোগ দিতে পারবে। ইতিমধ্যে নরওয়ে এ বিষয়ে ভাবছে।
ফ্রান্স ও জার্মানি পারমাণবিক প্রতিরোধ নিয়ে একটি যৌথ সমন্বয় গোষ্ঠীও গঠন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত তিন দশকে ফ্রান্সের পারমাণবিক নীতিতে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার পরিপূরক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের নিরাপত্তার বড় ভরসা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সুরক্ষা। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ইউরোপ নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে চাইছে।
মাক্রোঁ পরিষ্কার করে বলেন, এই নতুন উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়। বরং এটি একটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। এতে সম্ভাব্য আক্রমণকারীদের জন্য ঝুঁকি এবং খরচ আরও বাড়বে।
সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ফ্রান্সের হাতেই
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। এর মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সেই অভিযোগ খণ্ডন করা হয়েছে যে ফ্রান্স নাকি তার প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্য দেশের সঙ্গে ভাগ করে দিচ্ছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এই ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের এই নতুন কৌশল ইউরোপের সম্মিলিত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















