মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য সিনালোয়া বহু বছর ধরে মাদক কার্টেলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক ধস ও দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কের মধ্যে এবার নতুন এক বিতর্ক সামনে এসেছে—মেক্সিকোর মাটিতে মার্কিন সামরিক হামলার সম্ভাবনা। জাতীয়ভাবে এই ধারণার বিরোধিতা থাকলেও কার্টেল-প্রভাবিত এলাকায় কিছু মানুষ এখন এটিকে শেষ উপায় হিসেবেও ভাবতে শুরু করেছেন।
সিনালোয়ায় যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি
সিনালোয়া রাজ্যের রাজধানী কুলিয়াকানে গত প্রায় বিশ মাস ধরে সহিংসতা থামার কোনো লক্ষণ নেই। শক্তিশালী সিনালোয়া কার্টেলের ভেতরে বিভক্তি তৈরি হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। শহরের রাস্তায় এখন নিয়মিত টহল দেয় নিরাপত্তা বাহিনী, বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
স্থানীয় অনেক বাসিন্দা বলছেন, এতদিন নানা চেষ্টা করেও কার্টেল নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। ফলে তারা এখন এমন সমাধানের কথাও ভাবছেন যা আগে অকল্পনীয় ছিল। একজন তরুণ বিক্রেতা বলেন, সবকিছু চেষ্টা করেও যখন কাজ হয়নি, তখন আর কী উপায় বাকি থাকে—শান্তির জন্য মানুষ এখন যে কোনো পথ নিয়ে ভাবছে।

জাতীয় মতের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার সংঘাত
সম্প্রতি একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ মেক্সিকান নাগরিক তাদের দেশে মার্কিন সামরিক অভিযান চালানোর ধারণার বিরোধিতা করেন। কিন্তু সিনালোয়ার বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে বহু মানুষ মনে করেন, সরকার দীর্ঘদিন ধরেই কার্টেল দমনে ব্যর্থ হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, নিরাপত্তাহীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেকেই শুধু নিরাপদে বাঁচতে চান। তাদের কাছে প্রশ্ন এখন একটাই—যদি বাইরের কোনো শক্তি সহিংসতা থামাতে পারে, তবে তা বিবেচনা করা উচিত কি না।
হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কার্টেল
এদিকে কার্টেলের ভেতরেও উদ্বেগ বাড়ছে। কিছু সদস্য জানিয়েছেন, তারা এখন মার্কিন হামলার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। সেই আশঙ্কায় অস্ত্র মজুত করা হচ্ছে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্ত করা হচ্ছে।
তাদের মতে, আকাশপথে নজরদারি চালাতে পাহাড়ি এলাকায় প্রহরী বসানো হয়েছে। নতুন করে কেনা হচ্ছে রকেটচালিত গ্রেনেড ও ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এমনকি ড্রোনের সংকেত ব্যাহত করতে বিশেষ যন্ত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে, যার দাম কয়েক লাখ টাকার সমান হতে পারে।

কার্টেলের ভেতরে সন্দেহও বেড়েছে। তারা আশঙ্কা করছে, তাদের সংগঠনের মধ্যে মেক্সিকো কিংবা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার লোক ঢুকে পড়েছে। ফলে প্রতিটি পদক্ষেপ এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে।
সহিংসতার চক্রে বিপর্যস্ত অর্থনীতি
সিনালোয়ায় সহিংসতার প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতেও। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত দুই বছরে রাজ্যের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদন প্রায় দশ শতাংশ কমে গেছে। দুই হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হোটেল, পর্যটন ও রেস্তোরাঁ খাতে বিক্রি প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। অনেক এলাকায় রাত নামলেই রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষ রাতে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছে না।
সরকার বলছে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে
মেক্সিকোর সরকার সিনালোয়ায় বিশাল নিরাপত্তা অভিযান চালিয়েছে। সেখানে পাঠানো হয়েছে ১২ হাজারের বেশি সেনা ও নিরাপত্তা সদস্য। এর ফলে অনেক শীর্ষ কার্টেল সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে এবং বহু মাদক তৈরির কারখানা ধ্বংস করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালাতে হবে।

নিখোঁজ মানুষের খোঁজে পরিবারের মরিয়া চেষ্টা
সিনালোয়ায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক চিত্র দেখা যায় নিখোঁজ মানুষের পরিবারগুলোর মধ্যে। সপ্তাহে কয়েকবার তারা পাহাড়ি এলাকা ও ঝোপঝাড়ে খোঁজ চালান সম্ভাব্য গণকবরের।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সিনালোয়ায় ১৮ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে গত বিশ মাসেই নিখোঁজ হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ।
নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে থাকা এক মায়ের কথায়, মানুষের মনে এখন এতটাই হতাশা যে তারা যে কোনো সমাধানের কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।
মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে বিভক্ত মত
তবে সবাই মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের ধারণাকে সমর্থন করছেন না। অনেকেই মনে করেন, এতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
একজন তরুণ শিক্ষার্থী বলেন, এতে নিরীহ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন, সমস্যার সমাধান দেশের ভেতর থেকেই করতে হবে। তার মতে, মাদক সমস্যার মূল চাহিদা তৈরি হয় অন্য দেশগুলিতে, তাই দায় পুরোপুরি মেক্সিকোর নয়।
এই পরিস্থিতিতে সিনালোয়া এখন দাঁড়িয়ে আছে এক জটিল বাস্তবতার সামনে—যেখানে শান্তির আকাঙ্ক্ষা, জাতীয় গর্ব এবং নিরাপত্তাহীনতার ভয় একসঙ্গে মিশে গেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















