মার্কিন থিয়েটার জগতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপ এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি বাড়ায় অনেক মার্কিন প্রযোজক এখন নতুন নাটক ও সংগীতনাট্য মঞ্চস্থ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বদলে লন্ডনকে বেছে নিচ্ছেন। ব্রডওয়ের ঐতিহ্যবাহী মঞ্চ এখনও শিল্পীদের স্বপ্ন হলেও বাস্তবতা বলছে, কম খরচে নতুন প্রযোজনা শুরু করার জন্য লন্ডন হয়ে উঠছে আরও আকর্ষণীয় বিকল্প।
লন্ডনের একটি পুরোনো গুদামঘর থেকে রূপান্তরিত থিয়েটারে সম্প্রতি মঞ্চস্থ হয়েছে “বিউটিফুল লিটল ফুল” নামের একটি সংগীতনাট্য। বিখ্যাত মার্কিন সাহিত্যিক এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড ও তার স্ত্রী জেলদার সম্পর্ক নিয়ে নির্মিত এই নাটকটির প্রযোজকসহ সৃজনশীল দল প্রায় সবাই মার্কিন নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সম্ভাব্য মঞ্চ বিবেচনার পর তারা শেষ পর্যন্ত লন্ডনকে বেছে নেন শুধুমাত্র ব্যয়ের কারণে।
একই সময়ে আরেকটি বড় প্রযোজনা “দ্য গ্রেটেস্ট শোম্যান”, যা বিখ্যাত সার্কাস উদ্যোক্তা পি.টি. বার্নামের জীবনের গল্প থেকে নির্মিত, সেটিও ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে মঞ্চযাত্রা শুরু করেছে। এর সৃজনশীল দলের বড় অংশই মার্কিন হলেও নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হচ্ছে ব্রিটেনে।

খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে ব্রডওয়ে
গত এক দশকে ব্রডওয়ে প্রযোজনার ব্যয় নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে ২০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট বিরল ছিল, এখন তা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। মহামারির পর নতুন যে ৪৮টি সংগীতনাট্য ব্রডওয়েতে মঞ্চস্থ হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র চারটি এখন পর্যন্ত লাভ করতে পেরেছে।
এই বাস্তবতা বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক করে তুলেছে। ফলে অনেক প্রযোজক এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন নাটক তৈরি করে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া যাচাই করার কৌশল নিচ্ছেন। লন্ডনে প্রথমে মঞ্চায়ন করে পরে নিউইয়র্কে বড় আকারে প্রযোজনা করার পরিকল্পনাও দেখা যাচ্ছে।
লন্ডনে প্রযোজনা কেন সস্তা
মার্কিন প্রযোজকদের মতে, লন্ডনে থিয়েটার প্রযোজনার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই খরচ তুলনামূলক কম। অভিনেতা ও কর্মীদের পারিশ্রমিক, থিয়েটার ভাড়া, সরঞ্জাম ও সরবরাহ—সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম ব্যয়সাপেক্ষ।
উদাহরণ হিসেবে একটি ছোট থিয়েটারের সাপ্তাহিক ভাড়া লন্ডনে প্রায় ৯ হাজার ডলার, যেখানে নিউইয়র্কে একই ধরনের মঞ্চের ভাড়া ২২ হাজার ডলারের বেশি হতে পারে। অভিনেতাদের ন্যূনতম সাপ্তাহিক পারিশ্রমিকও লন্ডনে ব্রডওয়ের তুলনায় অনেক কম।

এছাড়া শ্রমনীতি এবং ইউনিয়নের নিয়মও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় সহজ হওয়ায় প্রযোজকদের জন্য পরিচালন ব্যয় কমে যায়।
সরকারি সহায়তা বড় সুবিধা
ব্রিটেনে থিয়েটার শিল্পকে উৎসাহ দিতে সরকারি করছাড় কর্মসূচি চালু রয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে অনেক প্রযোজনা তাদের যোগ্য ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ করছাড় হিসেবে ফেরত পায়।
যুক্তরাষ্ট্রে মহামারির পর একটি সীমিত করছাড় কর্মসূচি চালু থাকলেও সেটি তুলনামূলক কম এবং ইতিমধ্যে তার অর্থায়ন শেষ হয়ে গেছে। ফলে অনেক প্রযোজক মনে করেন, ব্রিটেনে কাজ করা আর্থিকভাবে অনেক বেশি নিরাপদ।
দর্শকসংখ্যায়ও এগিয়ে লন্ডন
মহামারির পর লন্ডনের থিয়েটার জগৎ দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে লন্ডনের প্রধান থিয়েটারগুলোতে প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখ দর্শক নাটক দেখেছেন, যেখানে একই সময়ে ব্রডওয়ের থিয়েটারগুলোতে দর্শক ছিল প্রায় ১ কোটি ৩৪ লাখ।

বিশ্লেষকদের মতে, লন্ডনে টিকিট তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় নতুন নাটক বা অপরিচিত শিরোনামের অনুষ্ঠানেও দর্শক টানা সহজ হয়।
লন্ডন থেকে আবার আমেরিকার পথে
অনেক প্রযোজকের লক্ষ্য এখনও যুক্তরাষ্ট্রে বড় মঞ্চে নাটক নিয়ে যাওয়া। তবে তারা এখন প্রথম ধাপ হিসেবে লন্ডনে কম খরচে নাটক তৈরি ও পরীক্ষা করার পথ বেছে নিচ্ছেন।
নতুন সংগীতনাট্য “বিউটিফুল লিটল ফুল”-এর দলও ইতিমধ্যে আগামী বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মঞ্চায়নের পরিকল্পনা করছে। তাদের মতে, লন্ডনে শুরু করায় প্রযোজনাটি বাস্তব রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে শুরু করলে অনেক বেশি কঠিন হতো।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















