পুরোনো অ্যানিমে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য চলতি সময়টি বিশেষ আনন্দের। সাম্প্রতিক সময়ে বহু ক্লাসিক অ্যানিমে নতুন করে বড় পর্দায় ফিরছে। আধুনিক প্রযুক্তিতে পুনর্গঠন বা রিমাস্টার করার মাধ্যমে এই চলচ্চিত্রগুলো আবার সিনেমা হলে দেখানো হচ্ছে, যা একদিকে পুরোনো দর্শকদের নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের দর্শকদেরও এসব ক্লাসিক কাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।
পুরোনো অ্যানিমের নতুন প্রদর্শনী
মার্চ মাসেই জাপানের অ্যানিমে ভক্তদের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুনঃপ্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছে। ৬ মার্চ মুক্তি পেয়েছে ২৫ বছর পুরোনো রাজনৈতিক থ্রিলার চলচ্চিত্র ‘জিন-রোহ: দ্য উলফ ব্রিগেড’-এর নতুন ৪কে সংস্করণ। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছিলেন হিরোইউকি ওকিউরা এবং চিত্রনাট্য লিখেছিলেন বিখ্যাত নির্মাতা মামোরু ওশি।
এর পর ২০ মার্চ প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হবে ‘ম্যাক্রস প্লাস: মুভি এডিশন’-এর ৪কে রিমাস্টার সংস্করণ। ১৯৯৫ সালের এই চলচ্চিত্রটি জনপ্রিয় মেকা অ্যাকশন সিরিজ ‘ম্যাক্রস’-এর ধারাবাহিক অংশ এবং এটি ছিল শিনিচিরো ওয়াতানাবের পরিচালনায় প্রথম কাজ।
গত কয়েক বছর ধরেই পুরোনো অ্যানিমে চলচ্চিত্র পুনরায় প্রদর্শনের প্রবণতা বাড়ছে। গত বছরই নতুন করে বড় পর্দায় দেখানো হয়েছে ‘প্রিন্সেস মনোনোকে’ (১৯৯৭), ‘অ্যাঞ্জেল’স এগ’ (১৯৮৫), ‘মেমোরিজ’ (১৯৯৫), ‘প্যাটলেবর: দ্য মুভি’ (১৯৮৯) ও তার সিক্যুয়েল (১৯৯৩), ‘ঘোস্ট ইন দ্য শেল’ (১৯৯৫) এবং ‘নিয়ন জেনেসিস ইভানজেলিয়ন’ সিরিজের ছয়টি চলচ্চিত্র।

কেন বাড়ছে পুরোনো অ্যানিমের চাহিদা
অ্যানিমেশন শিল্প বিশ্লেষক এবং আইচি নাগোয়া আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র উৎসবের শিল্প পরিচালক তাদাশি সুদোর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে নতুন চলচ্চিত্রের সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলোর সাফল্য অনেক সময় অনিশ্চিত থাকে। ফলে নির্মাতাদের জন্য ঝুঁকিও বেশি।
তিনি বলেন, নতুন চলচ্চিত্র তৈরি করার তুলনায় পুরোনো চলচ্চিত্রকে ৪কে প্রযুক্তিতে পুনর্গঠন করা অনেক কম ব্যয়বহুল। পাশাপাশি এসব চলচ্চিত্রের আগেই একটি স্থায়ী দর্শকগোষ্ঠী তৈরি থাকে। তাই ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেও এগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
নস্টালজিয়া ও নতুন দর্শকের মিলন
এই পুনঃপ্রদর্শনের মাধ্যমে শুধু পুরোনো দর্শকের স্মৃতিই জাগ্রত হয় না, বরং অনেক তরুণ দর্শকও এমন চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পান, যা আগে তারা কখনো দেখেননি। আবার কিছু চলচ্চিত্র, যেগুলো মুক্তির সময় যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি, সেগুলোও নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ পায়।
মামোরু ওশির পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র ‘অ্যাঞ্জেল’স এগ’ তার একটি উদাহরণ। ১৯৮৫ সালে মুক্তির সময় ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। পরবর্তী সময়ে সীমিত প্রদর্শনী এবং মূলত ঘরোয়া ভিডিও সংস্করণের মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু গত বছর আবার বড় পর্দায় ফিরে এসে নতুন দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ‘টেককনকিনক্রিট’। তাইয়ো মাতসুমোতোর মাঙ্গা অবলম্বনে নির্মিত ২০০৬ সালের এই চলচ্চিত্রটি দুই রাস্তার শিশুর গল্প নিয়ে তৈরি, যারা অপরাধচক্র ও নগর পুনর্গঠনের চাপের মুখে পড়া একটি শহরে বেঁচে থাকার লড়াই করে। স্টুডিও ৪°সে-এর প্রযোজনায় মাইকেল এরিয়াস পরিচালিত ছবিটি ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী ৮ মে থেকে জাপানের প্রেক্ষাগৃহে দুই সপ্তাহের জন্য প্রদর্শিত হবে।
বড় পর্দার অভিজ্ঞতার গুরুত্ব
মাইকেল এরিয়াসের মতে, অনেক চলচ্চিত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য বড় পর্দায় দেখার মধ্যেই নিহিত। তিনি বলেন, বর্তমানে ফিজিক্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কমে গেছে এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ভিড়ে অনেক সময় চলচ্চিত্র হারিয়ে যায়। তাই আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
তাদাশি সুদোও একই মত প্রকাশ করেন। আগে ডিভিডি বা ব্লু-রে সংস্করণের জন্যই মূলত রিমাস্টার করা হতো। কিন্তু এখন ঘরোয়া ভিডিওর বাজার কমে যাওয়ায় সিনেমা হলে পুনঃপ্রদর্শন একটি বিকল্প পথ হয়ে উঠেছে।

এর উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় গত বছরের ‘প্রিন্সেস মনোনোকে’-এর পুনঃপ্রদর্শন। এই চলচ্চিত্রটি পুনরায় মুক্তির পর প্রায় ১২৮ কোটি ইয়েন আয় করে, যা একই বছরে মুক্তি পাওয়া অনেক নতুন অ্যানিমে চলচ্চিত্রের আয়ের চেয়েও বেশি।
সুদোর মতে, জাপানে স্টুডিও জিবলির চলচ্চিত্রগুলো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সহজলভ্য নয়। আবার অনেক পরিবারে এখন আর ডিভিডি বা ব্লু-রে প্লেয়ারও নেই। ফলে বড় পর্দায় এসব চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ দর্শকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।
দর্শকদের নিরাপদ পছন্দ
বক্স অফিসে পুরোনো চলচ্চিত্রের সাফল্য আরেকটি বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চলচ্চিত্র শিল্পে সিক্যুয়েল, রিবুট ও দীর্ঘমেয়াদি সিরিজের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়।
সুদোর মতে, এখন অনেক দর্শকের জন্য সিনেমা হলে যাওয়া বছরে কয়েকবারের বিশেষ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তারা এমন চলচ্চিত্র বেছে নিতে চান, যেগুলো আগেই জনপ্রিয় বা বিশ্বাসযোগ্য বলে পরিচিত।
হাতের আঁকার অ্যানিমেশনের অনন্যতা
তবে মাইকেল এরিয়াস মনে করেন, পুরোনো অ্যানিমে চলচ্চিত্রের প্রতি আকর্ষণের আরেকটি কারণ হলো তাদের শিল্পগুণ। তিনি বলেন, এসব ছবির চরিত্রগুলো হাতে আঁকা—সরাসরি কাগজে পেন্সিল দিয়ে—আর পটভূমি আঁকা হয়েছে তুলির আঁচড়ে। আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই ধরনের হাতে তৈরি শিল্পের আলাদা মূল্য রয়েছে।
তার ভাষায়, হাতে আঁকা অ্যানিমেশনের মধ্যে এমন উষ্ণতা, আকর্ষণ ও অপ্রত্যাশিত সৌন্দর্য থাকে, যা মানুষের স্পর্শ ছাড়া তৈরি করা খুবই কঠিন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















