২০০৮ সালে ৫৯ বছর বয়সে নির্মাতা জুন ইচিকাওয়া মৃত্যুবরণ করেন। তিনি রেখে যান ১৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত কাজ ২০০৪ সালের সম্পর্কভিত্তিক বিষণ্ন নাটক ‘টনি তাকিতানি’। এখন সেটিকে নতুন করে ৪কে প্রযুক্তিতে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
হারুকি মুরাকামির একটি ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি লেখকের নিজের কাজের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় চলচ্চিত্ররূপ হিসেবে পরিচিত।
মুরাকামির গল্প অবলম্বনে নির্মিত হওয়ায় ‘টনি তাকিতানি’ ইচিকাওয়ার কাজের তালিকায় আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এটিকে কেবল সাহিত্যিক সংযোগের কারণে নয়, বরং পরিচালকের নিজস্ব শৈলী ও ভাবনার সূক্ষ্ম এবং গভীর প্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়।
ইয়াসুজিরো ওজুর ভক্ত ছিলেন ইচিকাওয়া। তাই তার অনেক চলচ্চিত্রে ওজুর প্রভাব স্পষ্ট। এমনকি তার চলচ্চিত্রের নামেও সেই ছাপ দেখা যায়—‘দ্য টোকিও সিবলিংস’ (১৯৯৫), ‘টোকিও লালাবাই’ (১৯৯৭) এবং ‘ওসাকা স্টোরি’ (১৯৯৯)। তবে তিনি শুধু অনুকরণকারী ছিলেন না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৯৮ সালের অদ্ভুত সিজিআই চিত্রভিত্তিক অন্ধকার কৌতুকধর্মী চলচ্চিত্র ‘তাদোন তো চিকুয়া’।
‘টনি তাকিতানি’ যেন এই দুই প্রবণতার এক অনন্য মিশ্রণ—একদিকে মানবিক গল্প, অন্যদিকে নির্মাণশৈলীতে পরীক্ষামূলক উপস্থাপন।

সাধারণ চলচ্চিত্রের মতো দৃশ্য থেকে দৃশ্যে কাট ব্যবহার না করে ক্যামেরা ধীরে ডান দিক থেকে বাম দিকে এগিয়ে যায়, আর মাঝখানে তৈরি হয় ফাঁকা স্থান। যেন একটি বইয়ের পাতা ধীরে ধীরে উল্টে যাচ্ছে এবং কোমল কণ্ঠের একজন বর্ণনাকারী মূল গল্পের অংশ পড়ে শোনাচ্ছেন। যদিও পুরোপুরি মূল গল্প অনুসরণ করা হয়নি—ইচিকাওয়ার চিত্রনাট্য মুরাকামির গদ্য থেকে কিছুটা ভিন্ন।
এই নির্মাণশৈলী চলচ্চিত্রে এক ধরনের স্বপ্নময় আবহ তৈরি করে, যেখানে পর্দার ঘটনাগুলো বাস্তবতা থেকে সামান্য দূরে ঘটে চলেছে বলে মনে হয়।
গল্পটিও অনেকটা রূপকথার মতো, বিশেষ করে জাপানের অর্থনৈতিক বুদবুদ যুগের শেষ সময়কে ঘিরে—যে সময়ে মুরাকামি গল্পটি লিখেছিলেন, ১৯৯০ সালে।
গল্পের শুরুতে দেখা যায় টনির বাবা (ইসেই ওগাতা)। তিনি ছিলেন একজন ট্রাম্পেটবাদক, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাংহাইয়ে জ্যাজ বাজাতেন। জাপানের পরাজয়ের পর অল্পের জন্য মৃত্যুদণ্ড থেকে রক্ষা পান। পরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত টোকিওতে ফিরে এসে দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়াকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে জন্ম নেয় এক ছেলে।
একজন আমেরিকান পরিচিতের পরামর্শে ছেলের নাম রাখা হয় ‘টনি’। বিদেশি এই নামের ভার নিয়ে বড় হতে হয় টনিকে। শৈশব থেকেই সে নিঃসঙ্গ স্বভাবের। তবে বাবার মতো তারও সৃজনশীল প্রতিভা রয়েছে—চিত্রাঙ্কনে। এই প্রতিভার জোরেই সে একজন সফল চিত্রকর হিসেবে স্বচ্ছল জীবন গড়ে তোলে।
কিন্তু তার এই স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন বদলে যায় যখন তিরিশের কোঠায় থাকা টনি পরিচিত হয় ২২ বছর বয়সী ইকো (রি মিয়াজাওয়া)-র সঙ্গে।

দুজনের বয়সের পার্থক্য ১৫ বছর হলেও তাদের মধ্যে দ্রুত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। মাত্র পঞ্চম সাক্ষাতেই টনি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিছুটা দ্বিধার পর ইকো প্রস্তাবটি গ্রহণ করে।
বিয়ের পর তাদের জীবন সুখেই কাটতে থাকে। তবে ইকোর একটি অভ্যাস টনিকে উদ্বিগ্ন করে—তার অতিরিক্ত পোশাক কেনার নেশা। তবু টনি স্ত্রীর ফ্যাশনেবল সাজে আনন্দই পায়।
হঠাৎ একদিন অফস্ক্রিন সড়ক দুর্ঘটনায় ইকোর মৃত্যু ঘটে।
নির্জনতার এক গভীর আবহ
মৃদু রঙে ধারণ করা এবং ধীর গতিতে এগিয়ে চলা ‘টনি তাকিতানি’ চলচ্চিত্রটি প্রতিটি দৃশ্যে টনির একাকী জীবনের অনুভূতি দর্শকের সামনে তুলে ধরে।
ইকোর মৃত্যুর পর যখন টনি তার স্ত্রীর অসংখ্য পোশাকে ভরা একটি ঘরে একা বসে থাকে, তখন তার শূন্যতা যেন স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। তবে একই সঙ্গে বোঝা যায়—সে যেন আবার তার স্বাভাবিক নিঃসঙ্গ জীবনে ফিরে যাচ্ছে।
বাস্তবতা ও অদ্ভুততার সীমারেখা
চলচ্চিত্রটি একসময় অদ্ভুত ও কিছুটা অতিবাস্তব জগতে প্রবেশ করে। টনি তার অফিসে কাজের জন্য এমন এক তরুণীকে নিয়োগ দেয়, যিনি দেখতে অবিকল ইকোর মতো। চরিত্রটিও অভিনয় করেছেন রি মিয়াজাওয়া।

শর্ত ছিল—অফিসে কাজ করার সময় তাকে ইকোর পোশাক পরতে হবে, যেন সেটাই তার ইউনিফর্ম।
বিষয়টি শুনতে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু মেয়েটির প্রতিক্রিয়া একেবারেই ভিন্ন। এত সুন্দর পোশাকের স্তূপ দেখে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে—যেগুলো আর কখনো তাদের প্রকৃত মালিকের গায়ে উঠবে না।
এই দৃশ্যের বেদনাবোধ পর্দায় আরও তীব্রভাবে ধরা পড়ে, যা মুরাকামির মূল গল্পে ঠান্ডা বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছিল।
‘টনি তাকিতানি’ চলচ্চিত্রে ইচিকাওয়া একজন মহান লেখকের কল্পনার জগৎকে ব্যবহার করে তৈরি করেছেন এক সূক্ষ্ম অথচ গভীর শক্তিশালী শিল্পকর্ম।
চলচ্চিত্র পর্যালোচনা
টনি তাকিতানি (জাপানি শিরোনাম: টনি তাকিতানি ৪কে রিমাস্টার সংস্করণ)
রেটিং: পাঁচ তারকা
দৈর্ঘ্য: ৭৫ মিনিট
ভাষা: জাপানি
মুক্তি: ২৭ মার্চ
মার্ক শিলিং 



















