হাইতির রাজধানী পোর্ত-ও-প্রিন্স বহু বছর ধরে গ্যাং সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও অরাজকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। রাস্তা থেকে বাজার—সব জায়গাতেই অপরাধী গোষ্ঠীর দাপট সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রায় অসহনীয় করে তুলেছিল। তবে দীর্ঘ অস্থিরতার পর এখন প্রথমবারের মতো সেখানে পরিস্থিতি কিছুটা বদলানোর আভাস দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তা অভিযান জোরদার হওয়ায় গ্যাংদের প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে এবং নতুন করে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের আলোচনা সামনে এসেছে।
গ্যাং শাসনের নিচে বিধ্বস্ত রাজধানী
দীর্ঘদিন ধরে হাইতির রাজধানীর বড় অংশ কার্যত গ্যাংদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। শহরের এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় যেতে সাধারণ মানুষকে চাঁদা দিতে হতো। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও জোর করে অর্থ আদায় করা হতো, এমনকি খাদ্যপণ্যের উপরও তথাকথিত কর চাপানো ছিল সাধারণ ঘটনা।
এই পরিস্থিতির প্রভাব ভয়াবহ। দেশটিতে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে এবং বহু মানুষ চরম অনাহারের মুখে পড়েছে। চিকিৎসা ব্যবস্থাও প্রায় ভেঙে পড়েছে—অনেক ক্লিনিক বন্ধ হয়ে গেছে বা আংশিকভাবে চালু রয়েছে। সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রায় চৌদ্দ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।

নতুন নিরাপত্তা অভিযান ও গ্যাংদের পিছু হটা
দীর্ঘ অচলাবস্থার পর নিরাপত্তা বাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাংদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে। হাইতির জাতীয় পুলিশ বাহিনী নতুন প্রযুক্তি ও বেসরকারি নিরাপত্তা সহায়তা নিয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করেছে। ছোট আকাশযানের মাধ্যমে পরিচালিত লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় বহু গ্যাং সদস্য নিহত হয়েছে এবং তাদের প্রভাব কিছু এলাকায় কমতে শুরু করেছে।
জাতিসংঘ সমর্থিত নিরাপত্তা মিশনও নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়ানো এবং সরাসরি গ্যাং দমনের ক্ষমতা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন বাহিনীর প্রথম সেনাদল শিগগিরই সেখানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এই পদক্ষেপগুলোর ফলে রাজধানীর কিছু এলাকায় পরিস্থিতি সামান্য উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যদিও এখনও পুরো শহর নিরাপদ বলা যায় না।
নিরাপত্তা ছাড়া নির্বাচন নয়
হাইতিতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসন অনুপস্থিত। শেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৬ সালে, যার ফল নিয়েও বিতর্ক ছিল। এরপর রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয় এবং পরবর্তীতে দেশটির রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তোলে।

বর্তমানে নতুন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হলেও বিশ্লেষকদের মতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে সেই নির্বাচন অর্থবহ হবে না। ভোটাররা যদি ভয় ও অস্ত্রের চাপে ভোট দেন, তবে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।
রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কঠিন পথ
হাইতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা। দেশের প্রধান সড়কগুলো নিরাপদ করা গেলে খাদ্য ও পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক হবে এবং অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
একই সঙ্গে শক্তিশালী ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলাও জরুরি। পাড়া-মহল্লা ধরে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা না হলে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব পুরোপুরি ভাঙা কঠিন হবে।

নতুন নেতৃত্বের সন্ধানে হাইতি
নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলে দেশটি নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে সামনে পথ সহজ নয়। গ্যাং গোষ্ঠী ও পুরনো দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক শক্তি আবারও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে।
এই বাস্তবতায় হাইতির মানুষের সামনে বড় প্রশ্ন—কে সেই নেতা, যিনি অন্তত মৌলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারবেন এবং রাষ্ট্রকে আবার কার্যকর পথে ফিরিয়ে নিতে পারবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















