পারস্য উপসাগরের তপ্ত রোদ আর গভীর নীল জলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি দ্বীপ। চারপাশে প্রবাহিত হচ্ছে কোটি কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, সমুদ্রতলের পাইপলাইনের ভেতর দিয়ে যার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। এই দ্বীপই খার্গ—যাকে একসময় বিখ্যাত ইরানি লেখক জালাল আল-এ আহমাদ বলেছিলেন “পারস্য উপসাগরের অনাথ মুক্তা”।
আজকের দিনে বুশেহর প্রদেশের এই মাত্র ২২ বর্গকিলোমিটারের প্রবাল দ্বীপ শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, বরং ইরানের তেল অর্থনীতির স্পন্দিত কেন্দ্র। একই সঙ্গে এটি কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা এক নিষিদ্ধ এলাকা, যেখানে প্রবেশের অনুমতি রয়েছে কেবল সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্তদের। সামরিক নজরদারি, ইস্পাতের বেড়া এবং টহল টাওয়ারের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং আধুনিক জ্বালানি সাম্রাজ্যের মিলনস্থল।
যুদ্ধের নতুন কেন্দ্রবিন্দু
মার্চের মাঝামাঝি ভোরে আবারও আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে উঠে আসে খার্গ দ্বীপ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তার দেশের বিমানবাহিনী দ্বীপে অবস্থিত কিছু সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

তিনি জানান, ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বীপের তেল অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়নি। তবে হরমুজ প্রণালীর জাহাজ চলাচলে কেউ বাধা দিলে সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। এই বক্তব্যের পর থেকেই খার্গ দ্বীপকে ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন শুরু হয়েছে।
ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্র
ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে এবং বুশেহর বন্দর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ। আকারে ছোট হলেও এটি ইরানের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র।
দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপ থেকেই পরিচালিত হয়। প্রতি বছর প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এখান থেকে বিশ্ববাজারে পাঠানো হয়। গভীর সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় বিশাল সুপার ট্যাঙ্কার সহজেই এখানে নোঙর করতে পারে। এখান থেকে প্রধানত এশিয়ার বাজারে তেল যায়, যেখানে সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন।
দ্বীপে স্থাপিত টার্মিনালগুলোতে সমুদ্রের তলদেশ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল আসে আবুজার, ফরুজান ও দুরূদ নামের বড় অফশোর ক্ষেত্র থেকে। এরপর তা প্রক্রিয়াজাত হয়ে সংরক্ষণাগারে রাখা হয় অথবা সরাসরি ট্যাঙ্কারে তোলা হয়।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ থাকা সত্ত্বেও ইরান গত কয়েক বছরে এখানে অবকাঠামো সম্প্রসারণ করেছে। নতুন সংরক্ষণ ট্যাংক সংস্কারের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
সাম্রাজ্য, বাণিজ্য ও দখলের ইতিহাস
তেল আবিষ্কারের বহু আগেই খার্গ দ্বীপ ছিল সমুদ্রপথ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রাকৃতিক মিঠা পানির উৎস এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এটি বণিকদের জন্য আকর্ষণীয় ছিল।
ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারের সময় প্রথমে পর্তুগিজরা উপসাগরের অন্যান্য দ্বীপের সঙ্গে খার্গও দখল করে। পরে অষ্টাদশ শতকে ডাচরা এখানে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে এবং একটি শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করে। কিন্তু স্থানীয় শাসকের আক্রমণে সেই ডাচ দুর্গ ধ্বংস হয় এবং ১৭৬৬ সালে তারা দ্বীপ ছেড়ে চলে যায়।
বিশ শতকের শুরুতে ইরানের শাসক রেজা শাহ পাহলভি এই দ্বীপকে রাজনৈতিক বন্দিদের নির্বাসনস্থল হিসেবে ব্যবহার করেন। পরে ১৯৫৮ সালের পর থেকে এখানে আধুনিক তেল টার্মিনাল নির্মাণ শুরু হয়। ১৯৬০ সালে এখান থেকে প্রথম বড় তেল চালান বিশ্ববাজারে পাঠানো হয় এবং ধীরে ধীরে এটি ইরানের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন

আধুনিক তেল স্থাপনার আড়ালে লুকিয়ে আছে খার্গ দ্বীপের বিস্ময়কর প্রত্নসম্পদ। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষ দিক থেকেই এখানে মানুষের বসতি ছিল। এলামীয়, আখেমেনীয় এবং সাসানীয় যুগের নানা নিদর্শন এখনও দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
এখানে রয়েছে মীর মোহাম্মদ নামে একটি প্রাচীন মাজার, যার শঙ্কু আকৃতির গম্বুজ পাথর ও কাদা দিয়ে নির্মিত। কাছেই রয়েছে মীর আরাম মাজার, যেখানে ইসলামী লিপি খোদাই করা বিশাল পাথরের ফলক এবং প্রাচীন আগুনের চিহ্ন পাওয়া যায়।
দ্বীপের একটি ঐতিহাসিক কবরস্থানে পাশাপাশি রয়েছে জরথুস্ত্রী, খ্রিস্টান এবং সাসানীয় যুগের সমাধি। এছাড়া ডাচ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, প্রাচীন বাগান, পুরোনো রেললাইন এবং আখেমেনীয় যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিলালিপি এখানে দেখা যায়। সেই শিলালিপিকে পারস্য উপসাগরের নাম উল্লেখ করা সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্ননিদর্শনগুলোর একটি বলে মনে করা হয়।
যুদ্ধের ক্ষত ও আজকের বাস্তবতা
১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় খার্গ দ্বীপ ব্যাপক বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছিল। তেল স্থাপনাগুলো বারবার ধ্বংস হলেও পরে সেগুলো পুনর্গঠন করা হয়।
আজও দ্বীপটি কঠোর সামরিক নিরাপত্তায় ঘেরা। পর্যটকদের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ। তবে এই নিষেধাজ্ঞাই অনিচ্ছাকৃতভাবে দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশকে অনেকটাই অক্ষত রেখেছে।
গভীর সমুদ্রপথে যখন বিশাল ট্যাঙ্কারগুলো নিঃশব্দে দূরে সরে যায়, তখন প্রবাল তটে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন সমাধিগুলো যেন নীরবে স্মরণ করিয়ে দেয়—সাম্রাজ্য, যুদ্ধ কিংবা জ্বালানির রাজনীতি বদলালেও খার্গ দ্বীপ ইতিহাসের স্রোতের সঙ্গে চিরকাল জড়িয়ে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















