মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত দ্রুত তীব্র হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন সরকার নানা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তারা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং সংযম ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে।
তবে কয়েকটি দেশ এই সাধারণ অবস্থান থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যকে সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে অথবা সংঘাত বিস্তারের জন্য তাদের সমালোচনা করেছে। এর মাধ্যমে ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে মতামতের বৈচিত্র্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
উত্তর-পূর্ব এশিয়ার অবস্থান
উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিভিত্তিক মিত্র জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রকাশ্যে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করা থেকে বিরত থেকেছে।
জাপান সংঘাতের শুরুতেই পুনর্ব্যক্ত করেছে যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করা উচিত নয়। তবে হামলার বিষয়ে সরাসরি সমর্থন জানায়নি। টোকিও বরং জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ সপ্তাহে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে সরাসরি আলোচনা করবেন। এতে বোঝা যায়, জাপান প্রকাশ্য বিবৃতির চেয়ে ব্যক্তিগত সমন্বয়কেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়াও শক্ত সমর্থনের কোনো বিবৃতি দেয়নি, যা মিত্র সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে কিছুটা অস্বাভাবিক। সিউল সম্ভবত সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইছে এবং একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা ও নিজের জ্বালানি ঝুঁকির বিষয়টি সামলাতে চাইছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন স্বীকার করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে কিছু প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনরায় মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

চীন ও উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া
চীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা করেছে। তারা বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি তুলে ধরে উত্তেজনা বাড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং বলেছে ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। একই সময়ে বেইজিং নিজেকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে এবং বলছে যে তাদের কূটনীতি মার্কিন সামরিক শক্তির বিপরীতে স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
উত্তর কোরিয়া পূর্বানুমিতভাবেই হামলাকে “অবৈধ আগ্রাসন” বলে আখ্যা দিয়েছে এবং ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমকে “গ্যাংস্টারসুলভ আচরণে” অভিযুক্ত করেছে।
রাশিয়া ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অংশীদার হিসেবে উঠে আসা মঙ্গোলিয়া তাদের “তৃতীয় প্রতিবেশী” পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে।

তাইওয়ানের ব্যতিক্রমী অবস্থান
এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানের অবস্থান কিছুটা আলাদা। প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে প্রকাশ্যে ইরানি জনগণের জন্য “স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র” নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছেন। তাইপের এই অবস্থান আদর্শিক এবং কৌশলগত—গণতন্ত্র বনাম স্বৈরশাসনের দ্বন্দ্বের দৃষ্টিকোণ থেকে।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাবর্তনের পর ওয়াশিংটন থেকে মিশ্র সংকেত পাওয়ায় তাইওয়ান হয়তো মনে করছে, এমন প্রকাশ্য সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে সহায়ক হতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরপেক্ষতা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেশিরভাগ দেশ নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়া সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো মধ্যস্থতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে তেহরান সফরের প্রস্তাবও দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রাবোও ট্রাম্পের “বোর্ড অব পিস” উদ্যোগ থেকেও ইন্দোনেশিয়াকে প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছেন। গাজায় ফিলিস্তিন ইস্যুতে যথেষ্ট মনোযোগ না দেওয়া এবং ইরান সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের কারণেই তিনি এই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়েশিয়াও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তারা জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিভিত্তিক মিত্র ম্যানিলা ও ব্যাংককও আমেরিকা বা ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেনি। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতা ও ঐকমত্যভিত্তিক কূটনীতির ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে।
অন্যদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রুনেই বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে উদ্বেগ জানালেও ওয়াশিংটন বা জেরুজালেমকে সরাসরি সমালোচনা করেনি। লাওস ও মিয়ানমার প্রায় কোনো প্রকাশ্য মন্তব্যই করেনি।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিক্রিয়া
দক্ষিণ এশিয়াতেও সরকারগুলো প্রকাশ্য পক্ষ নেওয়া এড়িয়ে চলছে। বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে নিন্দা করেনি।
শ্রীলঙ্কা মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার পর কাছাকাছি থাকা ইরানি নাবিকদের উদ্ধার করতে সহায়তা করলেও কলম্বো কোনো পক্ষকে দোষারোপ করেনি এবং মানবিক নিরপেক্ষতার অবস্থান বজায় রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
নেপালও একই ধরনের সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং মূলত নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে নজর দিচ্ছে।
ভারত ও পাকিস্তানের ভিন্ন অবস্থান
ভারতের প্রতিক্রিয়া বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লি নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। তবে হামলার সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে যোগাযোগে দুই দেশের “বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব” পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
গত এক দশকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিন্ন উদ্বেগের কারণে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। যদিও ইরানের সঙ্গে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে—যেমন চাবাহার বন্দর উন্নয়ন—তবুও সামগ্রিকভাবে ভারতের কৌশলগত অবস্থান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে আছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান আরও তীব্র ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হলেও ইসলামাবাদ হামলার নিন্দা করেছে এবং খামেনির হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন, যা ইরান-সৌদি উত্তেজনা বাড়লে পাকিস্তানকে জটিল অবস্থায় ফেলতে পারে। করাচিতে ইরানপন্থী বিক্ষোভ এবং মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনার কাছে সহিংসতার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার সংঘাত শুরু হওয়ার পর এখনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।

ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রতিক্রিয়া
ওশেনিয়ার বেশিরভাগ দেশ—ফিজি, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ও ভানুয়াতু—মূলত ভ্রমণ সতর্কতা জারি এবং উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেই প্রতিক্রিয়া সীমিত রেখেছে। তাদের অগ্রাধিকার ভূরাজনৈতিক অবস্থান নয়; বরং নাগরিক সুরক্ষা, জ্বালানির দাম, প্রবাসী আয় এবং অর্থনৈতিক প্রভাব।
তবে পাপুয়া নিউ গিনি সন্ত্রাসবাদ ও পারমাণবিক বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সম্পর্কের প্রতিফলন।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের অবস্থান
অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের অন্যতম স্পষ্ট সমর্থক হিসেবে সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে না পড়ে, সে প্রচেষ্টাকে ক্যানবেরা সমর্থন করে।

যদিও এটি প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপের নিঃশর্ত সমর্থন নয়, তবু অস্ট্রেলিয়াকে মোটামুটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের কাছাকাছি রেখেছে। আলবানিজ আরও জানান, একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া মার্কিন সাবমেরিনে তিনজন অস্ট্রেলীয় কর্মী উপস্থিত থাকলেও তারা টর্পেডো হামলায় অংশ নেননি বা কোনো আক্রমণাত্মক অভিযানে যুক্ত হবেন না।
নিউজিল্যান্ড তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা করা মানেই “যে কোনো মূল্যে” সামরিক পদক্ষেপ সমর্থন করা নয়।

বহুমাত্রিক স্বার্থের বাস্তবতা
সব মিলিয়ে ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলের প্রতিক্রিয়া কোনো একক অবস্থান নির্দেশ করে না। বরং এতে দেখা যায় জোট রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আদর্শিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি—এই সবকিছুর সমন্বয়ে জটিল হিসাব-নিকাশ চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও প্রকাশ্যে উচ্ছ্বাস দেখানো এড়িয়ে গেছে, যদিও ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন থাকতে পারে। আবার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো অভ্যন্তরীণ জনমতকে উত্তেজিত করা বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি নিতে চায়নি।
সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে বিশ্বের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী এবং অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্রস্থল ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চল ইরান সংঘাতের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কোনো ঐক্যবদ্ধ ব্লক হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন স্বার্থের এক জটিল মোজাইক হিসেবে।
সংঘাত আরও তীব্র হলে এবং অতিরিক্ত সমর্থন প্রয়োজন হলে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের জন্য এই বৈচিত্র্য হতাশাজনক হতে পারে। তবে এটি একটি গভীর বাস্তবতাকেও তুলে ধরে—ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলে জোট ও অবস্থান ব্যাপকভাবে ভিন্ন, এবং দূরের সংঘাত বড় আকার ধারণ করলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অংশীদাররাও নিজেদের স্বার্থকে সতর্কভাবে বিবেচনা করে।
লেখক: ডেরেক গ্রসম্যান ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক। তিনি আগে র্যান্ড করপোরেশনে সিনিয়র প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহকারী প্রতিরক্ষা সচিবের দৈনিক গোয়েন্দা ব্রিফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডেরেক গ্রসম্যান 



















