পূর্ব চীন সাগরের কাছে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে জাপান। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বেইজিংয়ের কাছে একটি “কৌশলগত সীমা অতিক্রম” হিসেবে দেখা হতে পারে এবং এটি পূর্ব এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
জাপানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন
জাপানের প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা জানিয়েছেন, উন্নত টাইপ–১২ জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এই মাসের শেষের দিকে দক্ষিণ-পশ্চিম জাপানের কুমামোতো প্রদেশের ক্যাম্প কেঙ্গুন ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হবে।
সোমবার গভীর রাতে প্রথম দফার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র বহনকারী সামরিক যান ঘাঁটিতে পৌঁছেছে বলেও জানা গেছে।
এই সিদ্ধান্ত জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের পরিকল্পনার অংশ। সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সময়সূচি এক বছর এগিয়ে আনা হয়। মূল কারণ, তাইওয়ানের কাছে পূর্ব চীন সাগর এলাকায় চীনের সঙ্গে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা।
![]()
তাইওয়ান ইস্যু ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
চীন তাইওয়ানকে নিজের অংশ বলে মনে করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে একীভূত করার অবস্থান ধরে রেখেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, তবুও তারা জোর করে পরিস্থিতি পরিবর্তনের বিরোধিতা করে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, তাইপেকে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
টাইপ–১২ ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষমতা
মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ তৈরি করা উন্নত টাইপ–১২ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। আগে এর পরিসর ছিল মাত্র দুইশ কিলোমিটার। কিউশু দ্বীপ থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হলে তা প্রায় পুরো পূর্ব চীন সাগর এলাকা কভার করতে পারবে। এমনকি চীনের উপকূলীয় শহরগুলোকেও লক্ষ্যবস্তুতে আনা সম্ভব হবে। সম্ভাব্য তাইওয়ান প্রণালি সংঘাতে চীনা নৌবাহিনীকে প্রতিরোধ করাই এর মূল লক্ষ্য।
চীনের প্রতিক্রিয়া
জাপানের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে চীন। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন বলেছেন, জাপানের ডানপন্থী শক্তিগুলো পুনরায় সামরিকীকরণের পথে দ্রুত এগোচ্ছে।
তার মতে, জাপানের ভূখণ্ডের সীমার অনেক বাইরে আঘাত হানতে সক্ষম দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র মোতায়েন তাদের তথাকথিত প্রতিরক্ষামূলক নীতির আড়াল সরিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এটি নতুন ধরনের জাপানি সামরিকতাবাদের বাস্তব হুমকি, যা আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে।
পারস্পরিক প্রতিরোধের নতুন সমীকরণ
এশিয়া-প্যাসিফিক গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক জন ব্র্যাডফোর্ড মনে করেন, কুমামোতোতে টাইপ–১২ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন জাপানের সামরিক পরিকল্পনার একটি বড় উন্নয়ন। এর মাধ্যমে সংঘাতের সময় পুরো পূর্ব চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীকে লক্ষ্যবস্তুতে আনা সম্ভব হবে।
তার মতে, চীন দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি জাহাজকে ঠেকাতে যে আকাশভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহার করে আসছে, জাপানের নতুন ব্যবস্থা অনেকটা তার প্রতিফলন।
এই পরিস্থিতিতে পূর্ব চীন সাগরে যে কোনো দেশের নৌবাহিনীই জানবে যে তারা চীন কিংবা জাপান—দু’পক্ষের আঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে উভয় পক্ষই শক্তি প্রয়োগে সতর্ক থাকবে।
মিত্রজোটে জাপানের ভূমিকা বাড়ছে
![]()
মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্নেল রে পাওয়েল মনে করেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন প্রথম দ্বীপমালা বরাবর গড়ে ওঠা মিত্রজোটের ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করছে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের নতুন সামরিক মোতায়েনের সঙ্গে মিলিয়ে এটি চীনের সামরিক পরিকল্পনাকে আরও জটিল করে তুলবে।
একই সঙ্গে এতে জোটের মধ্যে জাপানের গুরুত্বও বাড়বে। কারণ দীর্ঘপাল্লার আঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জাপান নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলছে।
রাজনৈতিক উত্তেজনা ও প্রতিরক্ষা নীতি
চীন–জাপান সম্পর্ক ইতোমধ্যেই উত্তেজনাপূর্ণ। গত নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তাইওয়ানে আক্রমণ হলে জাপান সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে বলে মন্তব্য করেছিলেন। এতে বেইজিং তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
তাকাইচি সরকার জাপানের সামরিক শক্তি দ্রুত বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ মাসে দেশের প্রতিরক্ষা বাজেট মোট দেশজ উৎপাদনের দুই শতাংশে পৌঁছেছে, যা পরিকল্পনার দুই মাস আগেই অর্জিত হয়েছে।
সরকার প্রতিরক্ষা নীতিতেও পরিবর্তন আনতে চায়, যাতে চীন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি বাড়ানো যায়।
![]()
নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরিকল্পনা
গত মাসে জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি ঘোষণা করেন, ২০৩১ সালের মধ্যে তাইওয়ানের কাছে অবস্থিত ইয়োনাগুনি দ্বীপে টাইপ–০৩ মাঝারি পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হবে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি বলেছেন, চীন–জাপান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে জাপানের সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি জাপানকে অতীতের যুদ্ধকালীন আগ্রাসনের জন্য অনুশোচনা করার আহ্বান জানান।
চীনের কৌশলগত হিসাব জটিল হচ্ছে
ওয়াশিংটনের হাডসন ইনস্টিটিউটের গবেষক লিসেলোতে ওডগার্ডের মতে, উন্নত টাইপ–১২ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন জাপানের যুদ্ধোত্তর প্রতিরক্ষা নীতির অন্যতম বড় পরিবর্তন।

তার মতে, এই ব্যবস্থা জাপানে আক্রমণের খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং চীনের সামরিক পরিকল্পনাকে আরও জটিল করবে। এখন পূর্ব চীন সাগর বা তাইওয়ান অঞ্চলে কোনো অভিযান চালানোর আগে চীনকে সম্ভাব্য জাপানি পাল্টা আঘাতের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রটি চীনের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম হওয়ায় বেইজিং এটিকে সরাসরি সামরিক হুমকি হিসেবে দেখবে। এর ফলে চীনা সামরিক ঘাঁটি ও সরবরাহ কেন্দ্রগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং এই পদক্ষেপকে তাইওয়ান নিয়ে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবেও দেখতে পারে। এতে পারস্পরিক সন্দেহ বাড়বে এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে।
ফলে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে এবং পূর্ব চীন সাগর অঞ্চল ক্রমেই আরও সামরিকীকৃত হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















