নেপালের দুর্গম জুমলা জেলা যেন দেশের বাকি অংশ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন একটি ভূখণ্ড। হিমালয়ের দুর্গম পাহাড় কেটে তৈরি কার্নালি মহাসড়কই মূলত এই অঞ্চলের একমাত্র স্থল যোগাযোগের পথ। প্রায় এক লাখ বিশ হাজার মানুষের বাস সেখানে, আর তাদের অধিকাংশই নিজেদের উৎপাদিত খাদ্যের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করেন। কিন্তু এই স্বনির্ভরতা খুবই নাজুক। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টি দীর্ঘদিন ধরেই এখানকার মানুষের বাস্তবতা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় মৌচাষিরা একটি উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। মৌমাছির সংখ্যা কমে যাচ্ছে, চাকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং মধু উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে। অনেকের ধারণা, গত এক দশকে তাদের মৌমাছির প্রায় অর্ধেক হারিয়ে গেছে। তবে গবেষকদের মতে, সমস্যাটি শুধু মধু উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব আরও গভীর এবং সুদূরপ্রসারী।
ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ থমাস টিম্বারলেকের ভাষায়, স্থানীয় মানুষ মৌমাছিকে মূলত মধুর উৎস হিসেবে দেখলেও তারা উপলব্ধি করতে পারেননি যে এসব পরাগবাহক তাদের কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় টিম্বারলেক ও তাঁর সহকর্মীরা জুমলার ১০টি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকার সঙ্গে পরাগবাহকদের সম্পর্ক পরিমাপ করার চেষ্টা করেন। এক বছরের বেশি সময় ধরে তারা মানুষের খাদ্যাভ্যাস, কৃষি উৎপাদন, কৃষি আয় এবং ফসলের সঙ্গে পরাগবাহকদের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করেন। এমনকি মৌমাছির শরীরে জমে থাকা পরাগকণার সংখ্যাও গণনা করা হয়।

গবেষণার ফল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেখা যায়, স্থানীয় মানুষের ভিটামিন এ, ভিটামিন ই এবং ফলেট গ্রহণের ২০ শতাংশেরও বেশি সরাসরি পরাগবাহকদের অবদানের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে কৃষকদের মোট আয়ের ৪৪ শতাংশও এই প্রাকৃতিক সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত। মানবস্বাস্থ্য ও পরাগবাহকদের মধ্যকার সম্পর্কের এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ আগে খুব কমই পাওয়া গেছে।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এই জনগোষ্ঠীকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। স্থানীয় ফল ও সবজির উৎপাদন কমে গেলে তারা সহজে বাইরের অঞ্চল থেকে খাদ্য কিনে ঘাটতি পূরণ করতে পারবেন না। ফলে পরাগবাহকদের সংখ্যা হ্রাস সরাসরি তাদের পুষ্টি ও জীবিকার ওপর আঘাত হানতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন যে মানুষের খাদ্যব্যবস্থা পরাগবাহকদের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ২০১৫ সালে দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত এক গবেষণায় অনুমান করা হয়েছিল, যদি পৃথিবীর সব পরাগবাহক সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে অপুষ্টিজনিত রোগের কারণে প্রতিবছর অতিরিক্ত ১৪ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।
তবে গবেষকদের বর্তমান আগ্রহ কেবল সম্ভাব্য বিপর্যয়ের হিসাব নয়, বরং ইতোমধ্যে চলমান ক্ষতির মাত্রা বোঝা। জনস হপকিন্স ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানেটারি হেলথের পরিচালক স্যাম মায়ার্সের মতে, প্রশ্ন হলো—পরাগবাহকদের ঘাটতির কারণে আজ আমরা কী মূল্য দিচ্ছি?
মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগবাহক ফুলের পুরুষ অংশ থেকে স্ত্রী অংশে পরাগ স্থানান্তর করে উদ্ভিদের প্রজনন নিশ্চিত করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ফল, বীজ এবং নানা ধরনের খাদ্য উৎপাদিত হয়। বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কৃষিজ ফসল কোনো না কোনো মাত্রায় পরাগবাহকদের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু বিশ্বজুড়ে এসব প্রাণী ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে। বনভূমি, তৃণভূমি ও বুনো ফুলের আবাসস্থল শিল্পভিত্তিক কৃষি ও নগরায়ণের জন্য ধ্বংস হচ্ছে। কীটনাশক, বিশেষ করে নিওনিকোটিনয়েড জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ, মৌমাছির স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন এবং আগ্রাসী বহিরাগত প্রজাতির বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

জীববৈচিত্র্য বিষয়ক আন্তঃসরকারি বিজ্ঞান প্ল্যাটফর্ম আইপিবিইএস ২০১৬ সালে জানিয়েছিল, বিশ্বের ৪০ শতাংশের বেশি মৌমাছি প্রজাতি হুমকির মুখে থাকতে পারে। পরবর্তী গবেষণাগুলোও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অধিকাংশ বন্য পরাগবাহক গোষ্ঠীর সংখ্যা কমছে।
যদিও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পালিত মধুমৌমাছির সংখ্যা তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে, তবু বন্য পরাগবাহকদের হ্রাসই কৃষি উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। ২০২২ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, অপর্যাপ্ত পরাগায়নের কারণে বিশ্বব্যাপী ফল, সবজি ও বাদামজাতীয় খাদ্যের উৎপাদন ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে।
এই ক্ষতির স্বাস্থ্যগত প্রভাবও গুরুতর। গবেষকদের হিসাব বলছে, পরাগায়নের ঘাটতির কারণে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু ঘটছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রভাব শুধু দরিদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়; পূর্ব ইউরোপ এবং সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলের দেশগুলোতেও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
মায়ার্সের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রা ও লাল মাংসভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসের মতো বিপাকীয় রোগ ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ফল, সবজি, বাদাম ও বীজের মতো পুষ্টিকর খাদ্য এসব রোগের ঝুঁকি কমায়। কিন্তু পরাগবাহক কমে গেলে এসব খাদ্যের উৎপাদনও কমবে, দাম বাড়বে এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষি সম্প্রসারণের কারণে ভবিষ্যতে কোথায় পরাগায়ন সংকট সবচেয়ে বেশি হবে, তা নির্ধারণে বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেছেন। ফলাফলে দেখা গেছে, উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ভারতে আম, আফ্রিকায় কোকো এবং চীনে তরমুজ উৎপাদন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
তবে আশার খবরও রয়েছে। নেপালে সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা একটি জাতীয় পরাগবাহক কৌশল তৈরির কাজ করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বুনো ফুল রোপণ, মৌমাছির বাসা তৈরির উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি এবং কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর মতো সহজ পদক্ষেপ কৃষকের আয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে অপুষ্টিতে ভোগা জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশকে পুষ্টিঘাটতি থেকে বের করে আনা সম্ভব।
পরাগবাহকদের গুরুত্ব তাই শুধু প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রশ্ন নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগবাহকের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা মানে শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের ভবিষ্যৎকেই সুরক্ষিত করা।
গ্লোরিয়া ডিকি 



















