০৪:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
মঙ্গালুরু বন্দরে জ্বালানির জোয়ার, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল-গ্যাস আনলো জাহাজ ডিজেলের সিন্ডিকেটে জিম্মি ঝিনাইদহ, চাষাবাদে বাড়ছে খরচে কৃষকের দিশেহারা অবস্থা চাল-গম সংগ্রহে বড় ঘাটতি, সংসদীয় কমিটির সতর্কবার্তা—পরিকল্পনা জোরদারের তাগিদ রানের জাদুতে নতুন নায়ক স্মরণ, রঞ্জি ট্রফিতে ঝড় তুলে আইপিএল স্বপ্নে চোখ তেলবাজারে ধাক্কা, যুদ্ধ থামাতে প্রস্তাব—ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে আলাবামার ইসলামিক একাডেমি থেকে কংগ্রেস, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ইসলামভীতির নতুন ঢেউ দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে ঝড়ের ইঙ্গিত, জ্বালানি সংকটে টালমাটাল ঈদের ভিড়ে রংপুরে টিকিট সংকট, কাউন্টারে নেই—কালোবাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি “চিরতরে” শেষ করার যুদ্ধ কখনো শেষ হয় না, ইরান প্রসঙ্গে থমাস ফ্রিডম্যানের তিন নিয়ম ফসল ঘরে ওঠার আগেই দুর্যোগের ছায়া, আগাম বন্যা ও শিলাবৃষ্টিতে দিশেহারা কৃষক

যুক্তির শক্তিতে গড়া এক জীবন: দার্শনিক ইউর্গেন হাবারমাস আর নেই

শৈশবের কথা বলতে গেলে ইউর্গেন হাবারমাসের জীবন শুরুই হয়েছিল এক কঠিন বাস্তবতার মধ্যে। জন্মগত শারীরিক সমস্যার কারণে ছোটবেলায় তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারতেন না। স্কুলজীবনে উপহাস, বিচ্ছিন্নতা—সবকিছুই তাকে ঘিরে ছিল। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই যেন তার চিন্তার জগৎকে গড়ে তোলে অন্যভাবে। কথা বলা কঠিন হলেও, যোগাযোগের শক্তিতেই তিনি বিশ্বাস স্থাপন করেন আজীবন।

যোগাযোগের দর্শন: যুক্তির মাধ্যমে সমাজ

হাবারমাস বিশ্বাস করতেন, একটি আদর্শ সমাজ সেই যেখানে মানুষ সহিংসতার পথে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে মতভেদ মেটাবে। তার ধারণায় “জনপরিসর” এমন একটি জায়গা, যেখানে রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করবে। এখানে যুক্তিই হবে একমাত্র শক্তি, এবং “ভালো যুক্তির চাপ” দিয়েই মানুষকে প্রভাবিত করা সম্ভব।

German philosopher Juergen Habermas dies at 96

এই চিন্তা শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার পুরো একাডেমিক জীবনজুড়ে তিনি এই ধারণা প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। কান্ট, হেগেল ও ভাষাতত্ত্বের নানা ধারা থেকে প্রভাব নিয়ে তিনি তৈরি করেন নিজস্ব এক দর্শন, যা কোনো নির্দিষ্ট ঘরানায় আবদ্ধ ছিল না।

গণতন্ত্র নিয়ে আজীবন উদ্বেগ

গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য ছিল তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি মনে করতেন, আঠারো শতকের ইউরোপের কফিহাউস সংস্কৃতি ছিল গণতান্ত্রিক আলোচনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে মানুষ সংবাদপত্র ও জার্নাল থেকে জ্ঞান নিয়ে মুক্ত আলোচনায় অংশ নিত। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল ও বাণিজ্যিক গণমাধ্যম এই পরিসরকে সংকুচিত করে দেয়।

বিশ শতকে কল্যাণরাষ্ট্রের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বার্থ আরও খণ্ডিত হয়ে পড়ে। জাতীয়তাবাদ ও কর্তৃত্ববাদকে তিনি মানব অগ্রগতির প্রধান বাধা হিসেবে দেখতেন।

নাৎসি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

Jürgen Habermas Dies at 96; One of Postwar Germany's Most Influential  Thinkers - The New York Times

হাবারমাসের শৈশব কেটেছে নাৎসি জার্মানির মধ্যে। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন, যদিও তা ছিল অনেকটাই বাধ্যতামূলক। কিন্তু যুদ্ধের পর ন্যুরেমবার্গ বিচার ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভয়াবহতা তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, পুরো সমাজই এক অপরাধমূলক ব্যবস্থার অংশ ছিল। এই অভিজ্ঞতা তাকে আজীবন সতর্ক করে রাখে—ইতিহাসের সেই ভুল যেন আর কখনো না ঘটে।

ইউরোপীয় ঐক্যের স্বপ্ন

স্থায়ী শান্তির জন্য তার সবচেয়ে বড় আশা ছিল ইউরোপীয় ঐক্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে উঠে একটি যৌথ কাঠামো গড়ে তুললে সেখানে যুক্তিভিত্তিক আলোচনা সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই স্বপ্ন পুরোপুরি সফল হয়নি। সমালোচকরা তাকে অনেক সময় অতিরিক্ত আশাবাদী বলেও অভিহিত করেছেন।

Jürgen Habermas, Influential German Philosopher, Dies at 96

ডিজিটাল যুগে হতাশা

একবিংশ শতকে এসে তিনি দেখেন, যুক্তিনির্ভর আলোচনা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেট, যা হতে পারত আধুনিক জনপরিসর, সেটি হয়ে উঠেছে বিভাজন ও বিভ্রান্তির এক বিশাল ক্ষেত্র। মানুষ যুক্তির বদলে আবেগ ও সংঘর্ষে বেশি ঝুঁকছে। তবুও তিনি মানুষের সক্ষমতার ওপর আস্থা হারাননি।

শেষ দিন পর্যন্ত যুক্তির পক্ষে

সাত দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বই ও প্রবন্ধে মানব সমাজে যুক্তি, শালীনতা ও যৌথ উদ্দেশ্যের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি যোগাযোগের গুরুত্ব কখনো ভুলে যাননি। তার জীবন যেন প্রমাণ করে—কথা বলা কঠিন হলেও, চিন্তা ও যুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলানো সম্ভব।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মঙ্গালুরু বন্দরে জ্বালানির জোয়ার, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল-গ্যাস আনলো জাহাজ

যুক্তির শক্তিতে গড়া এক জীবন: দার্শনিক ইউর্গেন হাবারমাস আর নেই

১১:৩১:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬

শৈশবের কথা বলতে গেলে ইউর্গেন হাবারমাসের জীবন শুরুই হয়েছিল এক কঠিন বাস্তবতার মধ্যে। জন্মগত শারীরিক সমস্যার কারণে ছোটবেলায় তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারতেন না। স্কুলজীবনে উপহাস, বিচ্ছিন্নতা—সবকিছুই তাকে ঘিরে ছিল। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই যেন তার চিন্তার জগৎকে গড়ে তোলে অন্যভাবে। কথা বলা কঠিন হলেও, যোগাযোগের শক্তিতেই তিনি বিশ্বাস স্থাপন করেন আজীবন।

যোগাযোগের দর্শন: যুক্তির মাধ্যমে সমাজ

হাবারমাস বিশ্বাস করতেন, একটি আদর্শ সমাজ সেই যেখানে মানুষ সহিংসতার পথে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে মতভেদ মেটাবে। তার ধারণায় “জনপরিসর” এমন একটি জায়গা, যেখানে রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করবে। এখানে যুক্তিই হবে একমাত্র শক্তি, এবং “ভালো যুক্তির চাপ” দিয়েই মানুষকে প্রভাবিত করা সম্ভব।

German philosopher Juergen Habermas dies at 96

এই চিন্তা শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার পুরো একাডেমিক জীবনজুড়ে তিনি এই ধারণা প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। কান্ট, হেগেল ও ভাষাতত্ত্বের নানা ধারা থেকে প্রভাব নিয়ে তিনি তৈরি করেন নিজস্ব এক দর্শন, যা কোনো নির্দিষ্ট ঘরানায় আবদ্ধ ছিল না।

গণতন্ত্র নিয়ে আজীবন উদ্বেগ

গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য ছিল তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি মনে করতেন, আঠারো শতকের ইউরোপের কফিহাউস সংস্কৃতি ছিল গণতান্ত্রিক আলোচনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে মানুষ সংবাদপত্র ও জার্নাল থেকে জ্ঞান নিয়ে মুক্ত আলোচনায় অংশ নিত। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল ও বাণিজ্যিক গণমাধ্যম এই পরিসরকে সংকুচিত করে দেয়।

বিশ শতকে কল্যাণরাষ্ট্রের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বার্থ আরও খণ্ডিত হয়ে পড়ে। জাতীয়তাবাদ ও কর্তৃত্ববাদকে তিনি মানব অগ্রগতির প্রধান বাধা হিসেবে দেখতেন।

নাৎসি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

Jürgen Habermas Dies at 96; One of Postwar Germany's Most Influential  Thinkers - The New York Times

হাবারমাসের শৈশব কেটেছে নাৎসি জার্মানির মধ্যে। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন, যদিও তা ছিল অনেকটাই বাধ্যতামূলক। কিন্তু যুদ্ধের পর ন্যুরেমবার্গ বিচার ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভয়াবহতা তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, পুরো সমাজই এক অপরাধমূলক ব্যবস্থার অংশ ছিল। এই অভিজ্ঞতা তাকে আজীবন সতর্ক করে রাখে—ইতিহাসের সেই ভুল যেন আর কখনো না ঘটে।

ইউরোপীয় ঐক্যের স্বপ্ন

স্থায়ী শান্তির জন্য তার সবচেয়ে বড় আশা ছিল ইউরোপীয় ঐক্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে উঠে একটি যৌথ কাঠামো গড়ে তুললে সেখানে যুক্তিভিত্তিক আলোচনা সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই স্বপ্ন পুরোপুরি সফল হয়নি। সমালোচকরা তাকে অনেক সময় অতিরিক্ত আশাবাদী বলেও অভিহিত করেছেন।

Jürgen Habermas, Influential German Philosopher, Dies at 96

ডিজিটাল যুগে হতাশা

একবিংশ শতকে এসে তিনি দেখেন, যুক্তিনির্ভর আলোচনা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেট, যা হতে পারত আধুনিক জনপরিসর, সেটি হয়ে উঠেছে বিভাজন ও বিভ্রান্তির এক বিশাল ক্ষেত্র। মানুষ যুক্তির বদলে আবেগ ও সংঘর্ষে বেশি ঝুঁকছে। তবুও তিনি মানুষের সক্ষমতার ওপর আস্থা হারাননি।

শেষ দিন পর্যন্ত যুক্তির পক্ষে

সাত দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বই ও প্রবন্ধে মানব সমাজে যুক্তি, শালীনতা ও যৌথ উদ্দেশ্যের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি যোগাযোগের গুরুত্ব কখনো ভুলে যাননি। তার জীবন যেন প্রমাণ করে—কথা বলা কঠিন হলেও, চিন্তা ও যুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলানো সম্ভব।