বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১০ এপ্রিল এক অনন্য দিন। এই দিনেই স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। পরে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, যা পরে মুজিবনগর নামে পরিচিত হয়, সেই সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। তাই ১০ এপ্রিল কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিন নয়, এটি ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার দিন।
এই দিনের পেছনে ছিল দীর্ঘ বঞ্চনা, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অধিকারহীনতার ইতিহাস। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ বুঝতে শুরু করে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও তারা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে নেই। ভাষা, অর্থনীতি, প্রশাসন, সামরিক কাঠামো—সবখানেই বৈষম্য ছিল প্রকট। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে যে রাজনৈতিক চেতনা গড়ে ওঠে, তার প্রধান সংগঠক শক্তি হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ।
ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকারের পথে
বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের প্রথম বড় বাঁক আসে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলন কেবল ভাষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক চেতনার ভিতও শক্ত করে। এরপর একের পর এক আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, ছাত্রসমাজের সক্রিয়তা এবং জনতার জাগরণ বাঙালিকে স্বাধিকারের পথে এগিয়ে নেয়।
এই ধারাবাহিকতায় ছয় দফা হয়ে ওঠে বাঙালির মুক্তির সনদ। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে উত্থাপিত এই দাবি পূর্ব বাংলার মানুষকে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য দেয়। কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে বঞ্চিত মানুষের কাছে এটি ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অধিকার পুনরুদ্ধারের রূপরেখা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তখন শুধু একটি দলের নেতৃত্ব ছিল না, সেটি হয়ে উঠেছিল জনগণের আকাঙ্ক্ষার মুখপাত্র।

নির্বাচনের রায় অস্বীকার, ক্ষোভের বিস্ফোরণ
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জনসমর্থন পায়। বাঙালি জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তারা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে চায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই গণরায় মেনে নেয়নি। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পুরো পূর্ব বাংলা।
এরপর শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। মার্চের দিনগুলোতে কার্যত পাকিস্তানি শাসনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে পূর্ব বাংলায়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ জাতিকে সংগ্রামের চূড়ান্ত প্রস্তুতি দেয়। সেই ভাষণে তিনি একদিকে ধৈর্য, অন্যদিকে প্রতিরোধ—দুই পথই দেখান। বাঙালির ঘরে ঘরে তখন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২৫ মার্চের কালরাত ও যুদ্ধের সূচনা
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী নৃশংস সামরিক অভিযান শুরু করে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা, আগুন, ধ্বংস আর হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে তারা বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার উল্টোটা ঘটে। এই হামলাই বাঙালিকে চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতার যুদ্ধে নামিয়ে আনে।
২৬ মার্চ থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়। গ্রাম, শহর, সীমান্ত, জনপদ—সবখানেই গড়ে ওঠে প্রতিরোধ। সাধারণ মানুষ, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, পুলিশ, ইপিআর সদস্য—সবাই এই যুদ্ধে যুক্ত হতে থাকেন। কিন্তু একটি যুদ্ধকে সফল করতে শুধু সাহস নয়, দরকার সুসংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্বও। সেখানেই ১০ এপ্রিলের তাৎপর্য সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
১০ এপ্রিল কেন ঐতিহাসিক
১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো পায়। এ দিন স্বাধীনতার ঘোষণাকে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি দেওয়া হয়। যুদ্ধ তখন আর শুধু বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতিরোধ নয়, বরং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি স্বাধীনতার যুদ্ধ।
এই সরকারের কাঠামোয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। পরে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথের মধ্য দিয়ে এই সরকার প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু এর রাজনৈতিক জন্মদিন ১০ এপ্রিলই।
এই সরকার গঠনের ফলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক সমন্বয়, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সামরিক সংগঠন—সবকিছু একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে আসে। এটিই ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের পথে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপগুলোর একটি।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও জনগণের শক্তি
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে বোঝার জন্য আওয়ামী লীগের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচনের ম্যান্ডেট, অসহযোগ আন্দোলন—সবকিছু মিলিয়ে আওয়ামী লীগই বাঙালির জাতীয় রাজনৈতিক সংগ্রামের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তবে এই নেতৃত্বের শক্তি এসেছে জনগণের কাছ থেকে। গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ, শহরের শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী, পেশাজীবী—সবাই মিলে এই সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তির যুদ্ধে পরিণত করেছিলেন।
১০ এপ্রিলের সরকার গঠন তাই শুধু কয়েকজন নেতার সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ গণসংগ্রামের রাজনৈতিক পরিণতি। জনগণের ভোট, রক্ত, ত্যাগ আর প্রত্যয়ের ওপর দাঁড়িয়ে এই সরকার জন্ম নেয়।
রাষ্ট্রগঠনের ভিত
বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত হয়নি, এটি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সংগঠিত নেতৃত্ব এবং জনগণের ঐক্যের ওপরও দাঁড়িয়ে আছে। ১০ এপ্রিল সেই সত্যটিকেই প্রতিষ্ঠা করে। কারণ একটি যুদ্ধ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার পেছনে থাকে বৈধ নেতৃত্ব, রাষ্ট্রচিন্তা এবং জনগণের স্বীকৃতি। অস্থায়ী সরকার গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেই ভিত্তি নির্মাণ করেছিল।
আজ ১০ এপ্রিল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ধারাবাহিক সংগ্রাম, নেতৃত্ব, আত্মত্যাগ এবং জনগণের অদম্য আকাঙ্ক্ষার ফসল। এই দিনে গঠিত সরকার মুক্তিযুদ্ধকে শুধু দিকনির্দেশনা দেয়নি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রসত্তারও ভিত গড়ে দিয়েছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















