ভারতে অবস্থিত দূতাবাস থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো ২৩৯ নম্বর টেলিগ্রামে জানানো হয়, ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার বঙ্গভবন থেকে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের উদ্দেশে পাঠানো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি আবেদনপত্র ৬ জানুয়ারি দূতাবাসে জমা পড়ে। চিঠিটিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্বাক্ষর ছিল। একই ধরনের আরেকটি চিঠি ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ হাইকমিশনও পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সার্বভৌম স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ঘোষণার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। এতে বলা হয়, এই ঘোষণা বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সর্বসম্মত রায়ের প্রতিফলন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের মানুষের রক্ত, জীবন ও সম্পদের বড় অবদান ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অধীনে বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন নির্মম ঔপনিবেশিক শাসন, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক শোষণ এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার হয়। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ মৌলিক অধিকার অর্জনের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যায়। পাকিস্তানের ধারাবাহিক শাসকগোষ্ঠী সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করলেও তারা সহিংসতার পথ বেছে নেয়নি।

চিঠিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের কথাও তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশের মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও নীতির প্রতি বিপুল আস্থা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সামরিক শাসকেরা বারবার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে এবং আলোচনার ভান করতে করতে নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে তারা পরিকল্পিতভাবে নিরস্ত্র ও নিরপরাধ নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর সেনা অভিযান চালায়। বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয় বুদ্ধিজীবী, তরুণ সমাজের অগ্রণী অংশ এবং শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রনেতাদের। এর ফলে স্বাধীনতা ঘোষণা এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
চিঠিতে বলা হয়, দমন-পীড়নের নীতি ক্রমেই আরও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। উদ্দেশ্য ছিল নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করা এবং পাকিস্তানের ভেতরে বাংলাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরাও এই সন্ত্রাসের বিশেষ শিকার হন। গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ফলে প্রায় এক কোটি নারী, পুরুষ ও শিশু দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
এরপর বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয় এবং মুক্তিযুদ্ধ আরও জোরদার হয়। সাবেক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং অন্যান্য আধাসামরিক বাহিনীর প্রায় ৬০ হাজার সদস্য বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে মাতৃভূমির প্রতিরক্ষায় অস্ত্র তুলে নেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন লক্ষ লক্ষ তরুণ, যাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য গড়ে তোলা হয়।

চিঠিতে জানানো হয়, এই সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে ভারতের সশস্ত্র বাহিনী সহায়তা করেছে বাংলাদেশের অনুরোধে, যখন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী বিনা উসকানিতে ভারতের ওপর হামলা চালায়। বলা হয়, এই উন্নয়ন কেবল জনগণের বিস্তৃত অংশই স্বাগত জানায়নি, বরং সমগ্র জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও বিপুল সমর্থনও প্রকাশ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরবর্তী সরকারি ঘোষণাগুলো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবগতির জন্য সংযুক্ত করা হয়েছে। সেখানে পুনর্ব্যক্ত করা হয় যে রাষ্ট্রনীতির মৌলিক ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং এমন একটি সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, যেখানে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য থাকবে না। পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সব ধরনের উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার নীতি অনুসরণ করবে বলেও জানানো হয়।
ভারতে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিকের প্রসঙ্গে বলা হয়, তাদের দ্রুত নিজ নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় ইচ্ছা রয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক যেসব চুক্তি ও দায়বদ্ধতার উত্তরাধিকারী হতে পারে, সেগুলো পূরণ করার সক্ষমতা ও সদিচ্ছা রাখে।

শেষাংশে বলা হয়, বাংলাদেশ যখন এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা এবং জোটনিরপেক্ষ বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাশে নিজ অবস্থান গ্রহণ করছে, তখন সে বান্দুং ও লুসাকার নীতিমালার প্রতি নিজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে। এক প্রজন্মের মধ্যে দুইবার সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসার সংগ্রাম বাংলাদেশের মানুষের সেই অঙ্গীকারের বাস্তব প্রমাণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সব দেশের উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নীতিগত সমর্থন দিয়ে যাবে বলে জানায়।
চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে দ্রুত স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, এমন স্বীকৃতি বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি হবে। পাশাপাশি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার জন্যও এটি একটি অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করা হয়।
চিঠির সমাপ্তিতে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মানের আশ্বাস জানানো হয়।
কিটিং 



















