ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজধানীর আকাশে ছড়িয়ে পড়ে এক অন্যরকম আবহ। সূর্যের প্রথম আভা দেখা দিতেই রমনার বটমূল প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে মানুষের ঢলে। লাল-সাদা পোশাকে নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতি যেন জানান দেয়—নতুন বছরকে ঘিরে বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি আর আত্মপরিচয়ের এক মহামিলনমেলা।
ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজনের ধারাবাহিকতা
১৯৬৭ সাল থেকে পহেলা বৈশাখে প্রভাতি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করে আসছে ছায়ানট। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানাতে আয়োজন করা হয় সুর ও ভাবনায় ভরপুর এক পরিবেশনা। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’, যা মানবমুক্তি ও সাহসী চেতনার বার্তা বহন করে।

গানে গানে নতুন দিনের সূচনা
সকাল সোয়া ছয়টায় সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গান দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এই গান যেন নতুন দিনের দরজা খুলে দেওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠে। এরপর একে একে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, দ্বিজেন্দ্রগীতি ও লালনগীতি।
শিল্পীদের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গানে যেমন আবেগের ছোঁয়া ছিল, তেমনি নজরুলের গানে উঠে আসে প্রতিবাদ আর সাম্যের শক্তি। লালনের গানে ফুটে ওঠে মানবিক বোধ আর আধ্যাত্মিকতার গভীরতা।
সংস্কৃতি ও মানবতার বার্তা
লোকগান, পল্লীগীতি এবং সম্মেলক পরিবেশনায় গাওয়া হয় নানা গান, যেখানে বারবার উঠে আসে মুক্তচিন্তা, মানবতা আর সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা। আবৃত্তিতেও ছিল ভিন্নমাত্রা, যেখানে কবিতার শব্দে প্রতিফলিত হয় সময়ের ভাবনা ও বাস্তবতা।
প্রায় দুই শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে এই আয়োজন পরিণত হয় এক সম্মিলিত সাংস্কৃতিক প্রবাহে। শিশু থেকে প্রবীণ—সবাই মিলিয়ে যেন এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

বক্তব্যে উঠে এল সময়ের বাস্তবতা
অনুষ্ঠানের শেষদিকে ছায়ানটের সভাপতির বক্তব্যে ফুটে ওঠে সময়ের অস্থিরতা, সহিংসতা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর বাড়তে থাকা চাপের কথা। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পহেলা বৈশাখ শুধু উৎসব নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব ও পরিচয়ের প্রতীক।
তিনি বলেন, অতীতেও সংস্কৃতির ওপর আঘাত এসেছে, এমনকি এই বটমূলও সেই ইতিহাসের সাক্ষী। তবু গান, কবিতা আর সংস্কৃতির চর্চা থামেনি, থামবে না।
শান্তির প্রত্যাশা আর নতুন দিনের স্বপ্ন
অনুষ্ঠানের মূল সুর ছিল একটাই—অসহিষ্ণুতার সময়েও শান্তির আকাঙ্ক্ষা। এমন এক সমাজের স্বপ্ন, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারে, গান গাইতে পারে, সংস্কৃতি চর্চা করতে পারে।
নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে সেই প্রত্যাশাই উচ্চারিত হয়েছে বটমূলে—ভয়হীন, মুক্ত ও মানবিক এক সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে।
নতুন বছরে ছায়ানটের এই আয়োজন আবারও মনে করিয়ে দিল—সংস্কৃতিই বাঙালির সবচেয়ে বড় শক্তি।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















