যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছে। তবে চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি এবং উভয় পক্ষই জানিয়েছে, স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা এখনও বাকি।
সোমবার ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে পৌঁছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, চুক্তিটি ইতোমধ্যে সই হয়েছে। তিনি বলেন, আগামী শুক্রবার জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অংশ নেবেন।
৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ
নতুন সমঝোতার আওতায় এপ্রিল মাসে ঘোষিত নাজুক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হবে। পাশাপাশি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে হরমুজ প্রণালি, যা ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছিল ইরান।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল বাণিজ্য এই সংকীর্ণ নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। চুক্তির খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নেমে আসে গত তিন মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
পরবর্তী ধাপে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে পরবর্তী ধাপে বিস্তারিত আলোচনা হবে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি মাত্র দেড় পৃষ্ঠার একটি সাধারণ নথি। আগামী দুই দিনের মধ্যে এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা স্থায়ীভাবে পরিত্যাগ করতে হবে এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করতে হবে। এর বিনিময়ে দেশটি বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত পাওয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে সম্ভাব্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিলের সুবিধা পেতে পারে।
ইরানের অবস্থান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সমঝোতাকে সংঘাত বন্ধের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির জন্য চূড়ান্ত চুক্তি এখনও হয়নি।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সামরিক উদ্দেশ্যে নয়। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনায় ফিরতে সম্মত হওয়া ছাড়া তারা বড় কোনো ছাড় দেয়নি।
লেবানন ইস্যুতে মতপার্থক্য
চুক্তির সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে লেবানন। ইরান বলছে, সেখানে ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হওয়া চুক্তির অংশ হওয়া উচিত। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান অব্যাহত রাখবে এবং হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দেওয়ার অধিকারও সংরক্ষণ করবে।
মার্কিন কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এই চুক্তির শর্ত নয়। ফলে বিষয়টি ভবিষ্যৎ আলোচনায় বড় বাধা হয়ে থাকতে পারে।
যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
ফেব্রুয়ারি থেকে চলা সংঘাতে অন্তত ৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যদিও নতুন চুক্তি হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর পথ খুলে দিয়েছে, তবে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন শিপিং খাতের সংশ্লিষ্টরা।
চুক্তিটিকে সংঘাত নিরসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। ফলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আগামী দফার আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হলেও স্থায়ী সমঝোতা এখনও হয়নি। হরমুজ প্রণালি খুলছে, কমেছে তেলের দাম, তবে রয়ে গেছে বহু অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্র_ইরান #ইরান #যুক্তরাষ্ট্র #হরমুজ_প্রণালি #মধ্যপ্রাচ্য #যুদ্ধবিরতি #ডোনাল্ড_ট্রাম্প #পারমাণবিক_কর্মসূচি #লেবানন #হিজবুল্লাহ #আন্তর্জাতিক_রাজনীতি #বিশ্বসংবাদ



















