সিঙ্গাপুরে স্কুলে বুলিং ও শিক্ষার্থীদের অসদাচরণ দমনে বড় পরিবর্তন আসছে। ২০২৭ সাল থেকে দেশটির সব স্কুলে একক ও মানসম্মত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে শাস্তির ক্ষেত্রে সমতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যায়।
নতুন এই নীতির আওতায় গুরুতর অপরাধে প্রথমবার জড়িত শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ তিন দিনের ডিটেনশন বা সাময়িক বরখাস্ত—অথবা দুটিই—প্রযোজ্য হবে। পাশাপাশি তাদের আচরণগত গ্রেডও কমিয়ে দেওয়া হবে। প্রথমবার অপরাধে এক ঘা বেত্রাঘাত এবং পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন ঘা পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তবে এই শাস্তি শুধু উচ্চ প্রাথমিক শ্রেণি ও তার ঊর্ধ্বের ছেলেদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
গুরুতর ও অতি গুরুতর অপরাধের আলাদা শ্রেণিবিন্যাস
নীতিমালায় অপরাধগুলোকে ‘গুরুতর’ ও ‘অতি গুরুতর’—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বুলিং, নকল, জুয়া খেলা, ভেপিংসহ আইনভঙ্গের নানা কাজকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে অগ্নিসংযোগ, মাদক সেবন, সহিংস মারামারি কিংবা এমন অপরাধ যা গুরুতর শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়—এসবকে অতি গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বুলিংয়ের ক্ষেত্রে শাস্তি নির্ধারণে ঘটনার প্রভাব, উদ্দেশ্য এবং অপরাধীর আচরণের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করা হবে। এতে প্রতিটি ঘটনার গভীরতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
কেন এই পরিবর্তন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক মাধ্যমে কয়েকটি বুলিংয়ের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর শিক্ষা ব্যবস্থার শাস্তি প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। এক ঘটনায় তৃতীয় শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী সহপাঠীর মাকে হত্যার হুমকি দেয়, যার পর তাদের বরখাস্ত করা হয় এবং একজনকে বেত্রাঘাত করা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে এক বছরব্যাপী পর্যালোচনার মাধ্যমে এই নতুন সুপারিশগুলো তৈরি করা হয়েছে। এতে দুই হাজারের বেশি মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, একক নীতিমালা চালু হলে সব স্কুলে একই ধরনের নির্দেশনা থাকবে এবং শাস্তি প্রয়োগে অসামঞ্জস্য কমবে।
বুলিংয়ের হার কিছুটা বেড়েছে
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্কুলে প্রতি এক হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে বুলিংয়ের হার দুই থেকে বেড়ে তিনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে এই হার ছয় থেকে বেড়ে আটে পৌঁছেছে।
এই বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়েই সরকার আরও কঠোর ও সংগঠিত পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
অভিযোগ জানানো আরও সহজ হচ্ছে
শিক্ষার্থীরা যাতে সহজে বুলিংয়ের অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য নতুন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবে। পাশাপাশি রিপোর্টিং ফরমও সরবরাহ করা হবে।
সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি একটি নতুন অনলাইন নিরাপত্তা কমিশনে বিষয়টি জানানো যাবে, যা শিগগিরই চালু হবে।
স্কুলের স্বাধীনতাও থাকবে
একক নীতিমালা থাকলেও স্কুলগুলো তাদের নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা রাখবে। শিক্ষার্থীর বয়স, মানসিক অবস্থা, বিশেষ চাহিদা বা পরিপক্বতা বিবেচনায় নিয়ে শাস্তি নির্ধারণ করা হবে। প্রয়োজনে স্কুলগুলো অতিরিক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও যুক্ত করতে পারবে।
অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার
তদন্ত চলাকালে অভিভাবকদের নিয়মিত ও সময়মতো তথ্য দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে পরিবার ও স্কুলের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে এবং শিক্ষার্থীদের আচরণগত সমস্যা সমাধানে সহায়তা করবে।
বুলিংয়ের সংজ্ঞা ও বাস্তবতা
শিক্ষা কর্তৃপক্ষ বলছে, একবারের অযাচিত মন্তব্য বা ঝগড়া ‘ক্ষতিকর আচরণ’ হিসেবে ধরা হলেও বুলিং বলতে বোঝায় বারবার এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা। এই পার্থক্য স্পষ্ট করেই নতুন নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















