নিউইয়র্কের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা আর ঝলমলে সামাজিক অনুষ্ঠানের আড়ালে এখন শুরু হয়েছে এক নতুন বিতর্ক। শহরের নতুন মেয়র জোহরান মামদানি ধনীদের ওপর কর বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জন্য সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন, আর তাতেই অস্বস্তিতে পড়েছেন অনেক ধনী বাসিন্দা।
মেট গালা এড়িয়ে বার্তা
মে মাসের শুরুতেই শহরের সবচেয়ে আলোচিত অনুষ্ঠান মেট গালা। সাধারণত রাজনীতিকদেরও সেখানে দেখা যায়। কিন্তু এবার মেয়র মামদানি এই অনুষ্ঠান এড়িয়ে গেছেন। অনেকের মতে, ধনীদের ওপর কর আরোপের পরিকল্পনার মধ্যেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা এড়াতে চেয়েছেন। আগে এক মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ‘ট্যাক্স দ্য রিচ’ লেখা পোশাক পরে এই অনুষ্ঠানে এসে বিতর্কে পড়েছিলেন।
ধনীদের করেই উন্নয়নের স্বপ্ন
মামদানির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে বাস, শিশুসেবা এবং ভর্তুকিযুক্ত সুপারমার্কেট চালু করা। এই সব প্রকল্পের অর্থ জোগাড়ের জন্য তিনি উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করেন।
এই উদ্যোগের প্রথম ধাপ হিসেবে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকুল ‘পিয়েদ-আ-তেরে’ কর প্রস্তাব করেছেন। এটি মূলত শহরে থাকা দ্বিতীয় বাড়ির ওপর আরোপিত কর, যেগুলোর মূল্য ৫০ লাখ ডলারের বেশি এবং মালিকরা সেখানে নিয়মিত থাকেন না বা ভাড়া দেন না। মেয়র এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন এবং বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন।
সম্ভাব্য আয় ও প্রভাব
মেয়রের আশা, এই নতুন কর থেকে বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলার আয় হবে। করের হার ধাপে ধাপে নির্ধারণ করা হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউইয়র্কে উচ্চমূল্যের আবাসিক সম্পত্তি তুলনামূলকভাবে কম করের আওতায় রয়েছে, তাই এই উদ্যোগ খুব বড় চাপ সৃষ্টি করবে না।
তবে এর কিছু প্রভাব পড়তে পারে। বিলাসবহুল বাড়ির দাম কিছুটা কমতে পারে এবং যেসব মালিক বাড়ি ব্যবহার করেন না, তারা হয়তো তা বিক্রি করে দেবেন। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ধনীদের উদ্বেগ ও সমালোচনা
ধনী ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই কর নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, করের হার বেশি হলে বা কাঠামো সঠিক না হলে বিনিয়োগকারীরা শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে পারেন। এতে নিউইয়র্কের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কিছু বিশিষ্ট ধনী ব্যক্তি প্রকাশ্যে এই নীতির সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, যারা শহরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছেন, তাদের নিরুৎসাহিত করা ঠিক হবে না। এতে মূলধন সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাস্তবতা এখনো নিয়ন্ত্রিত
যদিও বিতর্ক তীব্র, বাস্তবে এখনো বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। মেয়রের অনেক বড় পরিকল্পনা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন হচ্ছে বা এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। করের চাপও এখনো সীমিত পর্যায়েই রয়েছে।
এছাড়া সম্প্রতি একটি শ্রমিক ধর্মঘট শেষ মুহূর্তে এড়ানো গেছে, যা হলে শহরের ধনীদের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত। ফলে আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আছে।
ঝলমলে শহর, চলমান দ্বন্দ্ব
সব বিতর্কের মাঝেও নিউইয়র্কের সামাজিক জীবন থেমে নেই। মেট গালা ঘিরে প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। এবারের থিম ‘ফ্যাশনই শিল্প’, যা আরও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে এই ঝলমলে আয়োজনের আড়ালে একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ধনীদের ওপর কর বাড়িয়ে কি সত্যিই শহরকে সবার জন্য সাশ্রয়ী করা সম্ভব, নাকি এতে অর্থনৈতিক ভারসাম্য আরও জটিল হয়ে উঠবে?
নিউইয়র্ক এখন সেই উত্তর খুঁজছে।
নিউইয়র্কে ধনীদের ওপর নতুন কর নিয়ে বিতর্ক, যেখানে শহরকে সাশ্রয়ী করার প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বিনিয়োগ ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















