গত কয়েক দশকে ইরানের সঙ্গে চীনের সামরিক সম্পর্ক একাধিক ধাপে বদলেছে। সরাসরি অস্ত্র বিক্রি থেকে সরে এসে এখন বেইজিং অনেকটাই ঝুঁকেছে পরোক্ষ সহায়তা ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সরবরাহের দিকে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ঘিরে এই সম্পর্ক আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও অভিযোগ
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, চীন হয়তো ইরানে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছে। যদিও চীন এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। বিষয়টি প্রমাণিত হলে এটি হবে চীনের দীর্ঘদিনের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্রও এ নিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করতে পারে।
আশির দশক: অস্ত্র বিক্রির স্বর্ণযুগ
১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চীনের অস্ত্র বিক্রি দ্রুত বেড়ে যায়। সে সময় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিকভাবে অস্ত্র রপ্তানিতে উৎসাহ পায়। ফলস্বরূপ ইরানে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র বিক্রি করা হয়।
একই সময়ে ইরাকেও অস্ত্র সরবরাহ করায় দুই পক্ষই একই উৎসের অস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধ চালায়। এতে আন্তর্জাতিক সমালোচনা তৈরি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর চাপ বাড়ায়।

নব্বইয়ের দশক: প্রযুক্তি স্থানান্তরের ধাপ
যুদ্ধের পর ইরান নিজস্ব সামরিক শিল্প গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু করে, যেখানে চীনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। চীনা প্রযুক্তির সহায়তায় ইরান ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায় এবং নিজস্ব অস্ত্র উন্নয়ন শুরু করে।
এই সময় চীন সরাসরি অস্ত্র বিক্রি কমিয়ে যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি সরবরাহে বেশি গুরুত্ব দেয়, যা সামরিক ও বেসামরিক—দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহারযোগ্য।
দুই হাজার সালের পর: দ্বৈত প্রযুক্তির কৌশল
২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর চীন আনুষ্ঠানিক অস্ত্র চুক্তি থেকে সরে আসে। তবে সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং চীন এমন প্রযুক্তি ও উপাদান সরবরাহ শুরু করে, যা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।
এই সহায়তার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক, ড্রোনের যন্ত্রাংশ এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি। বিশ্লেষকদের মতে, এসব সহায়তা ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কৌশলগত স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ
ইরান সংকটে চীনের বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে চীনের বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি হয়। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেও চীনকে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, চীন সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে পরোক্ষ সহায়তার পথেই এগোতে চাইছে। তবে আন্তর্জাতিক চাপ ও নতুন অভিযোগ এই কৌশল কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















