আড়াইশ বছর আগে আমেরিকা মূলত ছিল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, যা স্বাভাবিকভাবেই আবহাওয়ায় প্রভাবিত হতো, কিন্তু প্রকৃত ব্যবসা চক্র ছিল না। সেগুলো এসেছে উনিশ শতকে পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে। আর এভাবেই শুরু হয়েছিল আধুনিক যুগের গভীর ওঠানামা, যার সবচেয়ে খারাপ দুটি ছিল ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দা এবং ২০০৮ সালে শুরু হওয়া বৃহৎ মন্দা। সৌভাগ্যবশত, বিশ শতকের মহান অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস আমাদের দেখিয়ে দিয়েছিলেন, পুঁজিবাদের এই কর্মহীনতা সইতে হবে এমন নয়। সরকার এ নিয়ে কিছু করতে পারে। প্রবাদ আছে, প্রয়োজনই উদ্ভাবনের মা। ১৯৩৩ সালে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট যখন দায়িত্ব নেন, তখন আমেরিকা ইতোমধ্যে চার মূল্যবান বছর হারিয়েছে, মন্দার গভীরে আরও ডুবে। রুজভেল্ট কেইনসের বিস্তারিত ব্যাখ্যার অপেক্ষা করতে পারেননি। তিনি দৃঢ়ভাবে, কেউ বলতে পারেন প্রায় স্বজ্ঞাতভাবে, হস্তক্ষেপ করেছিলেন। তার এজেন্ডার কিছু উপাদান এখনো বিতর্কিত। মন্দার সময় বেকারত্ব প্রায় ২৫ শতাংশে উঠলেও বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, বাজারের ওপর ছেড়ে দিন, এটি নিজেই ঠিক হবে। কিন্তু কেইনসের রসিকতা ছিল, দীর্ঘমেয়াদে আমরা সবাই মৃত।
কেইনসের বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব
কেইনসের ১৯৩৬ সালের বই দ্য জেনারেল থিওরি অব এমপ্লয়মেন্ট, ইন্টারেস্ট অ্যান্ড মানি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব। সেই দিনের প্রভাবশালী মতবাদের বিপরীতে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, একা ছেড়ে দেওয়া বাজার দীর্ঘ সময়ের জন্য গভীর বেকারত্বে আটকে থাকতে পারে। এমনকি অর্থনীতিকে পূর্ণ নিয়োগে ফিরিয়ে আনার আত্ম-সংশোধনী শক্তি থাকলেও, তা এতটাই ধীরে কাজ করে যে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কষ্ট ঠেকানো যায় না। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, কেন গভীর মন্দায় রক্ষণশীল অর্থনীতিবিদদের পছন্দের মুদ্রানীতি অকার্যকর হবে। তিনি একটি সমাধানও দিলেন, সরকারি ব্যয় চাহিদা উদ্দীপ্ত করতে পারে এবং অর্থনীতিকে কাদা থেকে তুলে আনতে পারে। ভালো খবর এই যে মার্কিন সংবিধানে এই নতুন ধারণাগুলো পরীক্ষা করার ও যোগ্যতা দেখানোর যথেষ্ট নমনীয়তা ছিল, যদিও সংবিধান প্রণেতারা সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আগে কল্পনা করতে পারেননি। তখন সরকার অনেক ছোট ছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের অস্থিতিশীল পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করার জন্য সম্পদ বা হাতিয়ার ছিল না।
কেইনস কোনো বামপন্থী কট্টরপন্থী ছিলেন না। বৈষম্য নিয়ে তিনি অতিমাত্রায় চিন্তিত ছিলেন না, বাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাস করতেন এবং বিশ্বাস করতেন তার প্রস্তাবিত হস্তক্ষেপ, যা কোনো বিপ্লব নয় বরং একটি ছোট সংশোধন, পরিস্থিতি বাঁচাবে। তবু অনেকেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন কারণ তিনি বড় সরকারের যৌক্তিকতা দিয়েছিলেন। ডানপন্থী কিছু আদর্শবাদী চাইতেন দেশ মন্দায় থাকুক, তবু সরকার যেন উদ্ধারে না এগোয়। তাদের চোখে, যদি সরকার এটা করতে পারে, তাহলে আর কী কী করতে পারে সেটাও কে জানে। হয়তো সবাইকে ন্যূনতম পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা দিতে পারে। আর এসব হয়তো আমেরিকানরা তখন যে কৃপণ পরিমাণ কর দিতে হতো, তার চেয়ে বেশি কর দাবি করতে পারে। আজকের বিলিয়নেয়ার অলিগার্কদের পূর্বসূরিদের কাছে এটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক ছিল, কারণ ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী গ্রহণ করেছিল, যা প্রগতিশীল আয়কর আরোপের অনুমতি দিত।

সাপ্লাই-সাইডের পাল্টা ঢেউ ও ব্যর্থতা
পশ্চাৎদৃষ্টিতে রুজভেল্টের বাস্তববাদ ও কেইনসের ধারণা পুঁজিবাদকে পুঁজিপতিদের হাত থেকে রক্ষা করেছে। শেষোক্তরা যদি জিততেন, লাগামহীন পুঁজিবাদের ব্যর্থতা, শেষ না হওয়া এক মন্দায় আটকে থাকা অর্থনীতি, সম্ভবত গণতান্ত্রিক চাপের মুখে টিকে থাকতে পারত না। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি জোরদার কেইনসপন্থী অর্থনীতিবিদদের, যেমন জন কেনেথ গ্যালব্রেইথ, রবার্ট সলো ও পল স্যামুয়েলসনের, প্রভাবে কেইনসপন্থী নীতি গ্রহণ করেন তার অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে। ১৯৭০-এর দশক জুড়ে দেশ মুদ্রাস্ফীতির মুখোমুখি হলে, যা তখন ও আজও মূলত তেলের দামের তীব্র বৃদ্ধি দ্বারা সৃষ্ট, ডানপন্থীরা দাবি করেন কেইনস অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছেন। কেইনস অর্থনীতিকে পূর্ণ নিয়োগে রাখার জন্য মোট চাহিদা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকার ওপর জোর দিলেও, প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ভাষাটি উল্টে দিয়ে সরবরাহকে জোর দিয়েছিলেন। রক্ষণশীলরা যুক্তি দিয়েছিলেন, কর কম এবং নিয়ন্ত্রণ লঘু রাখলে বাজারের গতিময়তা পূর্ণ নিয়োগের সঙ্গে প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। তারা এতটাই আশাবাদী ছিলেন যে দাবি করেছিলেন, করের হার কমালে এত প্রবৃদ্ধি হবে যে কর-রাজস্বই বাড়বে। অবশ্যই তা হয়নি।
পরের দশকগুলোতে আমেরিকা বারবার মন্দায় গেছে, কিছু বেশ গভীর। তাতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে, লাগামহীন বাজার আত্ম-নিয়ন্ত্রণে ভালো নয়। বৃহৎ মন্দা ও কোভিড-১৯ মহামারিতে কেইনসপন্থী হস্তক্ষেপ, অর্থাৎ সরকারি ব্যয়, অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তবু সব প্রমাণের পরও রাজনৈতিক লড়াই চলছে। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় ভারসাম্যপূর্ণ-বাজেট সংশোধনী পাসের চেষ্টা হয়েছিল, যা কার্যত কার্যকর কেইনসপন্থী নীতি ঠেকিয়ে দিত। সৌভাগ্যবশত তা পরাজিত হয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সাপ্লাই-সাইড নীতির পুনরুজ্জীবন ঘটে, করপোরেশন ও অতি-ধনীদের কর বড় কাটার মাধ্যমে। আগের রিগ্যান নীতির মতো এই নীতিও ব্যর্থ হয়েছে। ঘাটতি বেড়েছে, প্রবৃদ্ধির বৃদ্ধি ছিল সামান্য, যদি কিছু থেকেই থাকে।
পূর্ণ নিয়োগ নিশ্চিতের অসমাপ্ত মিশন
আজ যদি সংবিধান তৈরি হতো, এই জ্ঞান নিয়ে যে সরকারের পূর্ণ নিয়োগে অর্থনীতি চালানোর সক্ষমতা আছে, প্রণেতারা সম্ভবত সেটি বাধ্যতামূলক করে দিতেন। দেশ এর সবচেয়ে কাছে গেছে ১৯৪৬ সালের কর্মসংস্থান আইনের মাধ্যমে, যা হোয়াইট হাউজে কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্স তৈরি করেছিল। এটি আমেরিকাকে অঙ্গীকারবদ্ধ করেছিল এমন পরিস্থিতি গড়তে, যাতে সক্ষম, ইচ্ছুক ও কাজ খোঁজা মানুষের জন্য কাজের ব্যবস্থা থাকে। সেই লক্ষ্য পূরণের সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও, প্রায়শই, অনেকের জন্য, আমরা ব্যর্থ হয়েছি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















