ক্যাম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের ব্যস্ত শহরের মাঝখানে একটি সোনালি আভাযুক্ত সুউচ্চ ভবন তৈরি হচ্ছে। এটি শুধু দেশের সর্বোচ্চ ভবনই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারণা চক্রের বিপুল অর্থের প্রতীক হিসেবেও দাঁড়িয়ে আছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই ভবনের সঙ্গে জড়িত একটি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে, কারণ তাদের বিরুদ্ধে অনলাইন প্রতারণা নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যাম্বোডিয়া সাইবার প্রতারণার একটি বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এতটাই যে, অনেক বিদেশি রাজনীতিবিদ দেশটিকে ‘স্ক্যামবডিয়া’ নামে অভিহিত করছেন। এই প্রতারণা চক্রগুলোতে হাজার হাজার মানুষকে জোরপূর্বক কাজ করানো হয়েছে, যেখানে তারা প্রেম, বিনিয়োগ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে মানুষকে প্রতারণা করে।
ক্ষমতার শীর্ষে প্রতারণার ছায়া
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্তে দেখা গেছে, ক্যাম্বোডিয়ার শাসকগোষ্ঠীর কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ব্যবসায়ী এই প্রতারণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত। চীনা বংশোদ্ভূত কয়েকজন ধনকুবের, যারা পরবর্তীতে ক্যাম্বোডিয়ার নাগরিক হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাইবার অপরাধ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
এদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিলিয়ন ডলারের সম্পদ গড়ে তুলেছেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর এড়িয়ে চলেছেন। এমনকি উচ্চপর্যায়ের সরকারি ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন।
বহু তদন্তে উঠে এসেছে, কিছু কোম্পানি হোটেল, ক্যাসিনো ও শিল্পপার্ক পরিচালনার আড়ালে প্রতারণা কার্যক্রম চালাত। এসব স্থানে কর্মরত অনেকেই দাবি করেছেন, তারা জোরপূর্বক আটক অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন।
অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাম্বোডিয়ায় প্রতারণা চক্রগুলোর বার্ষিক আয় প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা দেশের মোট অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশের সমান। এটি দেশের বৃহত্তম বৈধ খাত পোশাক শিল্পকেও ছাড়িয়ে গেছে।
শুধু ২০২৪ সালেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে পরিচালিত অনলাইন প্রতারণায় মার্কিন নাগরিকরা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৬৬ শতাংশ বেশি।
এই পরিস্থিতির কারণে ক্যাম্বোডিয়ার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একসময় যেখানে দেশটি আংকর ভাটের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্য পরিচিত ছিল, এখন অনেকেই দেশটিকে অনলাইন প্রতারণার কেন্দ্র হিসেবে দেখছে।
সরকারি অভিযান ও বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ক্যাম্বোডিয়া সরকার সম্প্রতি দেশজুড়ে অভিযান শুরু করেছে। শত শত অভিযানে বহু প্রতারণা কেন্দ্র বন্ধ করা হয়েছে এবং হাজার হাজার শ্রমিককে মুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২৫০টির বেশি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে, প্রায় ৭৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং ৪৮ হাজারের বেশি বিদেশি কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরও দুই লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গেছে।
তবে এই অভিযান পুরোপুরি সফল হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক বড় চক্র ভেঙে ছোট ছোট ইউনিটে বিভক্ত হয়ে শহরের বিভিন্ন ভবনে ছড়িয়ে পড়েছে, ফলে তাদের শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এই প্রতারণা কেন্দ্রগুলোর অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক দাসত্বের মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, তাদের মারধর করা হয়েছে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা হয়েছে এবং অন্য চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকরা পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ভবন থেকে লাফ দিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযান চলাকালে একটি পরিত্যক্ত কম্পাউন্ডে পাওয়া গেছে অসংখ্য নথি, যেখানে ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক হিসাব, পারিবারিক তথ্য এমনকি তাদের দৈনন্দিন রুটিন পর্যন্ত সংরক্ষিত ছিল। এসব তথ্য ব্যবহার করে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রতারণা চালানো হতো।
নতুন কৌশল ও বিস্তার
সম্প্রতি নতুন ধরনের প্রতারণা কৌশলও সামনে এসেছে। বিশেষ করে ‘ভার্চুয়াল গ্রেপ্তার’ নামে একটি কৌশলে ভুক্তভোগীদের বোঝানো হয় তারা অপরাধে জড়িত এবং নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে অর্থ স্থানান্তর করতে হবে।
এ ধরনের প্রতারণা চালাতে নকল পুলিশ অফিস তৈরি করা হয়, যেখানে কর্মীরা ইউনিফর্ম পরে কাজ করে।
অন্যদিকে, অভিযান শুরু হওয়ার পরও অনলাইনে নতুন প্রতারণা চাকরির বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে। অনেক বিজ্ঞাপনে কর্মীদের অফিসেই অবস্থান করতে বলা হয়, যা জোরপূর্বক শ্রমের ইঙ্গিত দেয়।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
সরকার বলছে তারা সম্পূর্ণভাবে এই প্রতারণা কার্যক্রম নির্মূল করতে চায়। তবে বাস্তবতা হলো, এখনও অনেক মূল হোতা গ্রেপ্তার বা বিচারের আওতায় আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত ইন্টারনেট, ডলারভিত্তিক অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার পারিবারিক উত্তরাধিকার—এই তিনটি বিষয় ক্যাম্বোডিয়াকে সাইবার অপরাধের জন্য উর্বর ক্ষেত্র করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু অভিযান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা কঠিন হবে।
Sarakhon Report 


















