মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানা ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ সৌদি আরবের অবস্থানকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া, ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, বরং কৌশলগত সংযম দেখিয়েছে।
সতর্ক অবস্থান ও ভারসাম্যের কৌশল
সৌদি আরব ঐতিহাসিকভাবে এমন একটি কৌশল অনুসরণ করে এসেছে, যেখানে একদিকে ইরানের প্রভাব সীমিত রাখা, অন্যদিকে আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ২০১৬ সালে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। তবে বর্তমান যুদ্ধ সেই সমঝোতাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। তবুও রিয়াদ চায় না, সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ুক।
সৌদি আরবের জন্য বড় উদ্বেগ হলো—যুদ্ধে সরাসরি জড়ালে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর হামলা বেড়ে যেতে পারে, যা লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানিকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করাও তাদের কাছে নিরাপদ মনে হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট
২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বাড়তে থাকে। ইয়েমেনে হুথিদের সমর্থন এবং ২০১৯ সালে সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা রিয়াদের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত প্রতিক্রিয়া সৌদি নেতৃত্বকে বুঝিয়ে দেয়—ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।
এর পর থেকেই সৌদি আরব নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং নতুন কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকে পড়ে। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমন্বয় সেই কৌশলেরই অংশ।

নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ
২০২৩ সালের হামাস-ইসরায়েল সংঘাত এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সৌদি আরবের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়েও উদ্বিগ্ন।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্ককে নিয়ে একটি নতুন আঞ্চলিক জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যা ইরান ও ইসরায়েল—উভয়ের প্রভাব মোকাবিলায় কাজে লাগতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
যুদ্ধ শেষ হলেও সৌদি আরবের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে। একটি দুর্বল কিন্তু আক্রমণাত্মক ইরান ভবিষ্যতেও উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ইরান মনে করে, এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট থাকলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। ফলে ভবিষ্যতে এই দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় আসতেই হবে।
কূটনীতি ও নতুন জোটের সন্ধান
দুই বিপরীত শক্তির মধ্যে পড়ে সৌদি আরব এখন নতুন কৌশল খুঁজছে। ইসরায়েলের আধিপত্য মেনে নেওয়া বা ইরানের স্থায়ী হুমকি—কোনোটিই তাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাই তারা আঞ্চলিক জোট শক্তিশালী করে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চাইছে।
পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সমন্বয় শুধু যুদ্ধ থামানোর জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের দিকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের ভূমিকা বাড়ানোর সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
সৌদি আরব বুঝে গেছে—এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি বা নিরাপত্তা এককভাবে সম্ভব নয়। ইরান ও সৌদি আরব ভৌগোলিকভাবে প্রতিবেশী, তাই সহাবস্থান ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। অন্যথায় সংঘাতের চক্র অব্যাহত থাকবে, যা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতাকে বিপদের মুখে ফেলবে।
ভালি নাসর 


















