যুক্তরাষ্ট্র থেকে এশিয়ার দিকে বিপুল সংখ্যক অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানিবাহী জাহাজ রওনা দিয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদক দেশটির রপ্তানি এখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ফলে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণে তা মোটেই যথেষ্ট নয়।
রপ্তানিতে রেকর্ড, তবুও ঘাটতি
পণ্যবাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল ও মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যথাক্রমে দৈনিক ৫.৪৪ মিলিয়ন ব্যারেল এবং ৫.৪৮ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছানোর পথে, যা ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ। জানুয়ারিতে এই পরিমাণ ছিল ৩.৯৪ মিলিয়ন এবং ফেব্রুয়ারিতে ৩.৮৬ মিলিয়ন ব্যারেল। এই দুই মাসের পরই ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা শুরু হয়।
রপ্তানির এই বৃদ্ধি সত্ত্বেও বৈশ্বিক বাজারে যে বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করা যাচ্ছে না।
এশিয়ায় সরবরাহ সংকট
অতিরিক্ত তেলের বড় অংশ যাচ্ছে এশিয়ায়, যেখানে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে যেত।
![]()
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এশিয়ায় তেল রপ্তানি ৩.২৯ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে, যা জানুয়ারির ১.১১ মিলিয়ন ব্যারেলের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। এপ্রিল মাসে এই পরিমাণ ২.২৭ মিলিয়ন ব্যারেল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই বৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ার ক্ষতি পূরণে যথেষ্ট নয়। এপ্রিল মাসে এশিয়ায় মোট সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.৮ মিলিয়ন ব্যারেলে, যেখানে মার্চে ছিল ১৮.৬৩ মিলিয়ন, ফেব্রুয়ারিতে ২৪.৮৭ মিলিয়ন এবং জানুয়ারিতে ২৪.২৪ মিলিয়ন ব্যারেল। অর্থাৎ যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল সরবরাহ কমে গেছে।
এই ঘাটতি সাময়িকভাবে মজুদ ব্যবহার করে সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সম্ভব নয়।
জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রেও একই চিত্র
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, পরিশোধিত জ্বালানির ক্ষেত্রেও একই সংকট দেখা যাচ্ছে। এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি পণ্য রপ্তানি ৩.৫৯ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে, যার মধ্যে ৩৮৬ হাজার ব্যারেল যাবে এশিয়ায়।
জানুয়ারিতে মোট রপ্তানি ছিল ২.৮৩ মিলিয়ন ব্যারেল, যার মধ্যে এশিয়ায় গিয়েছিল মাত্র ১ লাখ ৩২ হাজার ব্যারেল। অর্থাৎ এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত ২ লাখ ৫৪ হাজার ব্যারেল জ্বালানি এশিয়ায় যাচ্ছে।
তবে এটিও যথেষ্ট নয়, কারণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আগে যে ১.৫৮ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি এশিয়ায় যেত, তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১ হাজার ব্যারেলে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাব
রপ্তানি বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি উৎপাদকরা লাভবান হলেও, দেশটির ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়তে পারে। কারণ অভ্যন্তরীণ বাজারের সরবরাহের জন্য এখন বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
কৌশলগত মজুদের ভূমিকা
এই উচ্চমাত্রার রপ্তানি কতদিন ধরে রাখা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কৌশলগত তেল মজুদ থেকে সরবরাহ বাড়ানোর কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ঋণ হিসেবে বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যারা এই তেল নেবে, তাদের ভবিষ্যতে অতিরিক্ত তেলসহ তা ফেরত দিতে হবে।
সামনে আরও চাপের আশঙ্কা
জুলাইয়ের পর এই রপ্তানি কমে গেলে এশিয়ার ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও তা বিশ্ববাজারে মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে এশিয়ার জন্য এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

ক্লাইড রাসেল 



















