বিশ্ব আবারও শিখছে—জ্বালানি নিরাপত্তা কখনোই পরবর্তীতে ভাবার বিষয় নয়।
এটি এমন কিছু নয়, যা যুদ্ধ শুরু হলে, সমুদ্রপথ সংকুচিত হলে বা তেলের বাজারে আতঙ্ক দেখা দিলে হঠাৎ করে তৈরি করা যায়।
বরং এটি বহু বছরের প্রস্তুতির ফল, যা নীরবে, ধৈর্য নিয়ে এবং এমন শৃঙ্খলার মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়, যা কেবল গুরুতর রাষ্ট্রগুলোই ধরে রাখতে পারে।
চীন এখন সেই শৃঙ্খলার ফল দেখাচ্ছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো স্পষ্ট করে যে, জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘদিনের জোর দেওয়ার কারণে চীন বাহ্যিক ধাক্কার বিরুদ্ধে শক্তিশালী সুরক্ষা গড়ে তুলতে পেরেছে।
চীনা নেতারা বছরের পর বছর ধরে তেলের মজুত বাড়ানো, সংরক্ষণ ক্ষমতা সম্প্রসারণ, দেশীয় উৎপাদন বজায় রাখা এবং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করার কাজ করেছেন।
মার্চ মাসে চীনের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনায় কৌশলগত তেল মজুত আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্লেষকদের মতে প্রায় ৯০ কোটি ব্যারেল—অর্থাৎ প্রায় তিন মাসের আমদানির সমান।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট শুধু দামের বিষয় নয়, এটি সহনশীলতার বিষয়।
অনেক দেশ এখনো জ্বালানি নিরাপত্তাকে সংকীর্ণ বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে।
তারা ধরে নেয়, যতক্ষণ বাজারে তেল কেনা যায়, ততক্ষণ জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত। এই ধারণা এখন অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।
যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, সমুদ্রপথে বিঘ্ন, কৌশলগত সংকীর্ণ পথ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের যুগে জ্বালানিকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি অংশ হিসেবে বুঝতে হবে।

চীন এই বিষয়টি অধিকাংশ দেশের আগেই বুঝেছিল।
৬ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীনকে একটি “নতুন জ্বালানি ব্যবস্থা” পরিকল্পনা ও নির্মাণ দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন তুলনামূলকভাবে তেলের মূল্য ধাক্কা সামাল দিতে বেশি সক্ষম, কারণ তাদের জ্বালানি ব্যবস্থার অর্ধেকের বেশি এখনো কয়লার ওপর নির্ভরশীল, তাদের কাছে পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসা আমদানি মোট জ্বালানি ব্যবহারের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ।
এটাই মূল শিক্ষা। চীন কখনো একটি জ্বালানি উৎস, একটি অঞ্চল বা একটি পরিবহন পথের ওপর সব আশা রাখেনি। বরং বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
কয়লাকে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে ধরে রেখে একই সঙ্গে বায়ু ও সৌর শক্তি বাড়ানো হয়েছে।
জলবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নিরাপদ ও সুশৃঙ্খলভাবে পারমাণবিক শক্তি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতায়ন বাড়লেও দেশীয় তেল উৎপাদন ধরে রাখা হয়েছে।
এবং সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তেল মজুতকে আরও শক্তভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের সংশোধিত জ্বালানি আইনে সরকারি ও বেসরকারি উভয় কোম্পানির জন্য তেল মজুত রাখা আইনগত বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে, যা আগে কেবল নীতিগত সুপারিশ ছিল।
এটাই বাস্তব অর্থে কৌশলগত দূরদর্শিতা।
অনেক সময় দেশগুলো সংকটের সময় জরুরি বৈঠক করে, বিবৃতি দেয় এবং বাজারকে দোষারোপ করে।
চীন কঠিন পথটি বেছে নিয়েছে—সংকট পুরোপুরি আসার আগেই প্রস্তুতি নিয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে চীন অজেয়। কোনো দেশই নয়।
তবুও তথ্য বলছে, মার্চ মাসে চীনের সমুদ্রপথে তেল আমদানি ফেব্রুয়ারির তুলনায় কমেছে এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা ও বৈশ্বিক তেলের দামের ওঠানামার প্রভাব থেকে দেশটি পুরোপুরি মুক্ত নয়।
তবে সহনশীলতা আর ঝুঁকিমুক্ত থাকা এক নয়। মূল বিষয় হলো—যেখানে অনেক দেশের হাতে শুধু আশা রয়েছে, সেখানে চীন বাস্তব সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
বিশ্বের উচিত এটি স্বীকার করা, যদিও চীনের প্রতিটি পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি নয়।
স্বীকৃতি মানে আত্মসমর্পণ নয়, বরং যেখানে দক্ষতা আছে, তা মেনে নেওয়া।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য এই বার্তাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা আর ধরে নিতে পারি না যে খোলা সমুদ্রপথই আমাদের সুরক্ষা দেবে।
গুরুত্বপূর্ণ মজুত, বৈচিত্র্যময় বিদ্যুৎ উৎপাদন বা শক্তিশালী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া কেবল বাজারের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।
জ্বালানি নিরাপত্তাকে সংরক্ষণ, সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিশোধন, নবায়নযোগ্য শক্তি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে—যাতে এক নির্বাচনী মেয়াদের বাইরে গিয়ে চিন্তা করা যায়।
চীন দেখিয়েছে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়—এটি জাতীয় টিকে থাকার বাস্তব রূপ।
অস্বস্তিকর সত্যটি হলো, অনেক রাষ্ট্র শুধু সহনশীলতার কথা বলে, কিন্তু চীন সেটি বাস্তবে গড়ে তুলেছে।
এই কারণেই বড় ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কার সময় বেইজিং অন্যদের তুলনায় এগিয়ে দেখা যায়।
এবং এই কারণেই বিশ্বকে শুধু চীনের আকার নয়, তার কৌশলগত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড, আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগ কিংবা ২০৪৫ সালের কুয়ালালামপুর ভিশন—সব ক্ষেত্রেই আসিয়ানকে ভবিষ্যৎ নিয়ে সুসংগঠিতভাবে চিন্তা করতে হবে।
কুয়ালালামপুরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ গবেষণা ইনস্টিটিউটের নেতৃত্বে জিয়াউদ্দিন সারদার ও স্কট জর্ডানের মতো চিন্তাবিদদের উদ্যোগে এই ভাবনা আরও এগিয়ে নেওয়া দরকার।
কারণ সামনে এমন এক ভবিষ্যৎ আসছে, যেখানে একাধিক সংকট একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।
ভবিষ্যৎ গবেষণা, ইসলামী ভবিষ্যৎ এবং “পোস্ট-নরমাল টাইমস” তত্ত্ব নিয়ে তাদের কাজগুলো এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
লেখক আসিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক এবং মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ও আসিয়ান স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক।
ফার কিম বেং 



















