রাজধানীর গুলিস্তান ও বায়তুল মোকাররম এলাকার প্রধান ফুটপাতগুলো উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে দখলমুক্ত করার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই আবারও সেখানে হকারদের ফিরে আসা শুরু হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হচ্ছে না। বরং পুনর্বাসনের অভাবেই একই চক্র বারবার ঘুরে ফিরে আসছে।
উচ্ছেদের পরপরই কয়েকদিন ফুটপাতগুলো ছিল তুলনামূলক পরিষ্কার ও চলাচলের উপযোগী। কিন্তু সময় গড়াতেই আবারও দোকান বসতে শুরু করেছে। গুলিস্তান থেকে পল্টন পর্যন্ত এবং বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে এখন আবার আগের চিত্রই ফিরে আসছে।
হকারদের যুক্তি ও বাস্তবতা
ফুটপাতে ব্যবসা করা হকারদের অনেকেই বলছেন, তাদের অন্য কোনো বিকল্প জীবিকা নেই। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল থাকায় ঝুঁকি জেনেও তারা আবার ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। সীমিত পুঁজি নিয়ে ব্যবসা চালানোর জন্য ফুটপাতই তাদের একমাত্র ভরসা বলে জানান তারা।
অন্যদিকে পথচারীরা বলছেন, কয়েকদিনের জন্য ফুটপাত পরিষ্কার থাকলেও তা স্থায়ী হয়নি। এতে জনভোগান্তি আবারও বাড়ছে।

ফুটপাত অর্থনীতির বড় চিত্র
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ফুটপাত শুধু চলাচলের জায়গা নয়, এটি একটি বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন লাখ হকার সক্রিয়।
গুলিস্তান, ফার্মগেট ও নিউমার্কেটের মতো এলাকায় প্রতিদিন হাজারো অস্থায়ী দোকান বসে। এসব দোকানে পোশাক, খাবার, ইলেকট্রনিক পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কম দামে বিক্রি হয়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একজন হকার দৈনিক গড়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় করেন, তবে ব্যস্ত এলাকায় এই আয় আরও বেশি হতে পারে। এসব হিসাব অনুযায়ী ঢাকার ফুটপাতভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে ধারণা করা হয়।
চ্যালেঞ্জ: চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ
এই খাতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, অবৈধ নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ জড়িয়ে আছে। উচ্ছেদ অভিযানের পর অনেক ক্ষেত্রে চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। এতে নতুন করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দখলদারিত্বের চেষ্টা দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি, লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু, ডিজিটাল নিবন্ধন, নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ব্যবসা, ছুটির বাজার ও রাতের বাজার চালুর মতো উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তাদের মতে, সমস্যাটি শুধু ফুটপাত দখলের নয়; এটি দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে এই সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন।
সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এলাকা ভিত্তিক হকার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ে লাইসেন্সের মাধ্যমে সীমিত সংখ্যক হকারকে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ছুটির দিন ও রাতের বাজার চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
তাদের বক্তব্য, উদ্দেশ্য শুধু উচ্ছেদ নয়, বরং মানবিকভাবে পুনর্বাসনের মাধ্যমে জনদুর্ভোগ কমানো।

অমীমাংসিত প্রশ্ন
উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের এই চক্র চলতেই থাকায় এখন মূল প্রশ্ন একটাই—স্থায়ী সমাধানের পথে কি এগোবে কর্তৃপক্ষ, নাকি আগের মতোই এই চক্র অব্যাহত থাকবে?
ঢাকার ফুটপাত এখন আর শুধু দখলের বিষয় নয়; এটি শহরের অর্থনীতি, দারিদ্র্য এবং নীতিনির্ধারণের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















