মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যেন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঘনিষ্ঠ বলে মনে হতে পারে। যৌথ সামরিক অভিযান, পারস্পরিক রাজনৈতিক সমর্থন এবং নেতৃত্ব পর্যায়ের প্রকাশ্য প্রশংসা—সব মিলিয়ে এক দৃঢ় জোটের ছবি ফুটে ওঠে। কিন্তু এই দৃশ্যপটের আড়ালে ধীরে ধীরে যে পরিবর্তন ঘটছে, সেটিই হয়তো ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে: আমেরিকার জনমতের পরিবর্তন।
জনমতের এই পরিবর্তন কোনো সাময়িক আবেগ নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রে এখন এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আর স্বতঃসিদ্ধ নয়। বরং তরুণ প্রজন্ম, উদারপন্থী রাজনীতিক এবং এমনকি ডানপন্থী শিবিরের একাংশও ইসরায়েলের বর্তমান নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফলে দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় ঐকমত্যে যে ফাটল ধরেছে, তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট।
সমর্থনের এই ক্ষয় বোঝার জন্য ‘ইসরায়েল লবি’ নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সাধারণভাবে মনে করা হয়, এই লবির প্রভাবই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। ইহুদি সম্প্রদায়ের সংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা এবং তাদের রাজনৈতিক বৈচিত্র্য এই ধারণাকে আংশিক করে দেয়। প্রকৃতপক্ষে, ইসরায়েলের প্রতি ঐতিহ্যগত সমর্থন এসেছে বৃহত্তর আমেরিকান সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে—বিশেষ করে যারা ইসরায়েলকে একটি গণতান্ত্রিক মিত্র হিসেবে দেখেছে।

কিন্তু এই বিশ্বাসের ভিত্তিই এখন প্রশ্নের মুখে। গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, বিপুল প্রাণহানি এবং ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধানে অনীহা—এসব বিষয় ইসরায়েলের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। যখন কোনো রাষ্ট্র তার কৌশলগত স্বার্থের পাশাপাশি নৈতিক বৈধতাও হারাতে শুরু করে, তখন আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক: যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তন। ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্ব যেভাবে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছে, তা সম্পর্কটিকে দলীয় রঙে রূপান্তর করেছে। ফলে যে সম্পর্ক একসময় জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, তা এখন ক্রমশ রাজনৈতিক বিভাজনের অংশ হয়ে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। কংগ্রেসে সামরিক সহায়তা নিয়ে দ্বিধা, নির্বাচনে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়ে জয়লাভ, এমনকি ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যেও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি—সবই ইঙ্গিত দেয় যে পুরোনো সমীকরণ আর আগের মতো নেই।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি কৌশলগত। ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। এই সমর্থন শুধু অর্থনৈতিক বা সামরিক নয়; আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজনৈতিক সুরক্ষাও এর অংশ। যদি এই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ইসরায়েলকে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সামনে দুটি পথ খোলা। একদিকে, বর্তমান নীতি অব্যাহত রেখে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করা; অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্গঠন করা। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শক্তিশালী জোটও জনমতের পরিবর্তনের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই প্রশ্নটি এখন শুধু কূটনীতির নয়, দূরদর্শিতারও।
জোনাথন এয়াল 



















