০৭:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
‘প্রতাপ ডুবিল, শৈবালিনী ডুবিল না’—বঙ্কিমচন্দ্রের সেই পঙ্‌ক্তির যেন বাস্তব প্রতিধ্বনি যমুনা সেতুতে মন্ত্রী বদল নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্জাগরণই হওয়া উচিত সিঙ্গাপুরে উগ্রপন্থি পোস্টের অভিযোগে দুই বাংলাদেশির ওয়ার্ক পারমিট বাতিল, দেশে ফেরত পাঠানো হলো চাকরির বাজারে টিকে থাকার আসল শক্তি ডিগ্রি নয়, শেখার গভীরতা ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য অপসারণ ঘিরে ধোঁয়াশা, দায় নিচ্ছে না কোনো কর্তৃপক্ষ লামিনে ইয়ামালের চোট চিন্তায় স্পেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে বাড়ছে উদ্বেগ ট্রাম্পের চীনবিরোধী অভিযোগে নতুন করে চাপে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক বিশ্বকাপের মঞ্চে মালভিনাস বিতর্ক: ফুটবল কি সত্যিই রাজনীতি থেকে আলাদা থাকতে পারে? যুদ্ধের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে ফার্নবরো বিমান প্রদর্শনীর চিত্র, অস্ত্র প্রযুক্তিতে বাড়ছে নজর পেঁয়াজ-টমেটোর দাম আকাশছোঁয়া, সরবরাহ সংকটে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারে ভোগান্তি

ইসরায়েলের জন্য আসল সংকট: আমেরিকার সমর্থন হারানোর ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যেন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঘনিষ্ঠ বলে মনে হতে পারে। যৌথ সামরিক অভিযান, পারস্পরিক রাজনৈতিক সমর্থন এবং নেতৃত্ব পর্যায়ের প্রকাশ্য প্রশংসা—সব মিলিয়ে এক দৃঢ় জোটের ছবি ফুটে ওঠে। কিন্তু এই দৃশ্যপটের আড়ালে ধীরে ধীরে যে পরিবর্তন ঘটছে, সেটিই হয়তো ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে: আমেরিকার জনমতের পরিবর্তন।

জনমতের এই পরিবর্তন কোনো সাময়িক আবেগ নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রে এখন এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আর স্বতঃসিদ্ধ নয়। বরং তরুণ প্রজন্ম, উদারপন্থী রাজনীতিক এবং এমনকি ডানপন্থী শিবিরের একাংশও ইসরায়েলের বর্তমান নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফলে দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় ঐকমত্যে যে ফাটল ধরেছে, তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট।

সমর্থনের এই ক্ষয় বোঝার জন্য ‘ইসরায়েল লবি’ নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সাধারণভাবে মনে করা হয়, এই লবির প্রভাবই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। ইহুদি সম্প্রদায়ের সংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা এবং তাদের রাজনৈতিক বৈচিত্র্য এই ধারণাকে আংশিক করে দেয়। প্রকৃতপক্ষে, ইসরায়েলের প্রতি ঐতিহ্যগত সমর্থন এসেছে বৃহত্তর আমেরিকান সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে—বিশেষ করে যারা ইসরায়েলকে একটি গণতান্ত্রিক মিত্র হিসেবে দেখেছে।

Hopeless, Starving, and Besieged”: Israel's Forced Displacement of  Palestinians in Gaza | HRW

কিন্তু এই বিশ্বাসের ভিত্তিই এখন প্রশ্নের মুখে। গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, বিপুল প্রাণহানি এবং ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধানে অনীহা—এসব বিষয় ইসরায়েলের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। যখন কোনো রাষ্ট্র তার কৌশলগত স্বার্থের পাশাপাশি নৈতিক বৈধতাও হারাতে শুরু করে, তখন আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক: যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তন। ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্ব যেভাবে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছে, তা সম্পর্কটিকে দলীয় রঙে রূপান্তর করেছে। ফলে যে সম্পর্ক একসময় জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, তা এখন ক্রমশ রাজনৈতিক বিভাজনের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। কংগ্রেসে সামরিক সহায়তা নিয়ে দ্বিধা, নির্বাচনে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়ে জয়লাভ, এমনকি ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যেও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি—সবই ইঙ্গিত দেয় যে পুরোনো সমীকরণ আর আগের মতো নেই।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি কৌশলগত। ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। এই সমর্থন শুধু অর্থনৈতিক বা সামরিক নয়; আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজনৈতিক সুরক্ষাও এর অংশ। যদি এই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ইসরায়েলকে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

Israel in the shadow of American decline - Asia Times

এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সামনে দুটি পথ খোলা। একদিকে, বর্তমান নীতি অব্যাহত রেখে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করা; অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্গঠন করা। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শক্তিশালী জোটও জনমতের পরিবর্তনের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই প্রশ্নটি এখন শুধু কূটনীতির নয়, দূরদর্শিতারও।

ইসরায়েল যদি এই সংকেতগুলো উপেক্ষা করে, তাহলে হয়তো একদিন তারা বুঝতে পারবে—সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রকে হারানোর প্রক্রিয়াটি অনেক আগেই শুরু হয়েছিল, শুধু তা চোখে পড়েনি।
জনপ্রিয় সংবাদ

‘প্রতাপ ডুবিল, শৈবালিনী ডুবিল না’—বঙ্কিমচন্দ্রের সেই পঙ্‌ক্তির যেন বাস্তব প্রতিধ্বনি যমুনা সেতুতে

ইসরায়েলের জন্য আসল সংকট: আমেরিকার সমর্থন হারানোর ঝুঁকি

১২:৪৫:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যেন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঘনিষ্ঠ বলে মনে হতে পারে। যৌথ সামরিক অভিযান, পারস্পরিক রাজনৈতিক সমর্থন এবং নেতৃত্ব পর্যায়ের প্রকাশ্য প্রশংসা—সব মিলিয়ে এক দৃঢ় জোটের ছবি ফুটে ওঠে। কিন্তু এই দৃশ্যপটের আড়ালে ধীরে ধীরে যে পরিবর্তন ঘটছে, সেটিই হয়তো ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে: আমেরিকার জনমতের পরিবর্তন।

জনমতের এই পরিবর্তন কোনো সাময়িক আবেগ নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রে এখন এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আর স্বতঃসিদ্ধ নয়। বরং তরুণ প্রজন্ম, উদারপন্থী রাজনীতিক এবং এমনকি ডানপন্থী শিবিরের একাংশও ইসরায়েলের বর্তমান নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফলে দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় ঐকমত্যে যে ফাটল ধরেছে, তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট।

সমর্থনের এই ক্ষয় বোঝার জন্য ‘ইসরায়েল লবি’ নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সাধারণভাবে মনে করা হয়, এই লবির প্রভাবই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। ইহুদি সম্প্রদায়ের সংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা এবং তাদের রাজনৈতিক বৈচিত্র্য এই ধারণাকে আংশিক করে দেয়। প্রকৃতপক্ষে, ইসরায়েলের প্রতি ঐতিহ্যগত সমর্থন এসেছে বৃহত্তর আমেরিকান সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে—বিশেষ করে যারা ইসরায়েলকে একটি গণতান্ত্রিক মিত্র হিসেবে দেখেছে।

Hopeless, Starving, and Besieged”: Israel's Forced Displacement of  Palestinians in Gaza | HRW

কিন্তু এই বিশ্বাসের ভিত্তিই এখন প্রশ্নের মুখে। গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, বিপুল প্রাণহানি এবং ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধানে অনীহা—এসব বিষয় ইসরায়েলের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। যখন কোনো রাষ্ট্র তার কৌশলগত স্বার্থের পাশাপাশি নৈতিক বৈধতাও হারাতে শুরু করে, তখন আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক: যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তন। ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্ব যেভাবে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছে, তা সম্পর্কটিকে দলীয় রঙে রূপান্তর করেছে। ফলে যে সম্পর্ক একসময় জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, তা এখন ক্রমশ রাজনৈতিক বিভাজনের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। কংগ্রেসে সামরিক সহায়তা নিয়ে দ্বিধা, নির্বাচনে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়ে জয়লাভ, এমনকি ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যেও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি—সবই ইঙ্গিত দেয় যে পুরোনো সমীকরণ আর আগের মতো নেই।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি কৌশলগত। ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। এই সমর্থন শুধু অর্থনৈতিক বা সামরিক নয়; আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজনৈতিক সুরক্ষাও এর অংশ। যদি এই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ইসরায়েলকে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

Israel in the shadow of American decline - Asia Times

এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সামনে দুটি পথ খোলা। একদিকে, বর্তমান নীতি অব্যাহত রেখে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করা; অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্গঠন করা। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শক্তিশালী জোটও জনমতের পরিবর্তনের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই প্রশ্নটি এখন শুধু কূটনীতির নয়, দূরদর্শিতারও।

ইসরায়েল যদি এই সংকেতগুলো উপেক্ষা করে, তাহলে হয়তো একদিন তারা বুঝতে পারবে—সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রকে হারানোর প্রক্রিয়াটি অনেক আগেই শুরু হয়েছিল, শুধু তা চোখে পড়েনি।