বাংলাদেশে কর কাঠামো সহজ, নিরপেক্ষ ও পূর্বানুমানযোগ্য না হলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং বাজারে বিকৃতি কমানো সম্ভব নয়—এমন মত দিয়েছেন অর্থনীতি বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকরা। এক নীতি সংলাপে তারা বলেন, বর্তমান ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ব্যবস্থায় সংস্কার এনে তা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এখন সময়ের দাবি।
নীতিনির্ভর সংলাপের আয়োজন ও মূল আলোচনা
রবিবার অনুষ্ঠিত এক সংলাপে দেশের কর কাঠামোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, আধুনিক কর ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, সরলতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে কর আরোপের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা বজায় রাখা জরুরি, যাতে ব্যবসা ও ভোক্তা—দুই পক্ষই সুরক্ষিত থাকে।
কর ব্যবস্থার মৌলিক নীতি
বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি কার্যকর কর কাঠামোতে নিরপেক্ষতা, দক্ষতা, নিশ্চিততা ও সরলতা থাকতে হবে। ভ্যাট হওয়া উচিত প্রধান রাজস্ব উৎস, যেখানে একক হার থাকলে প্রশাসনিক জটিলতা কমে। আয়কর ব্যবস্থার মাধ্যমে ধাপে ধাপে কর আরোপ নিশ্চিত করা যায়, আর সম্পূরক শুল্ক প্রয়োগ করা উচিত মূলত ক্ষতিকর পণ্যের ওপর, যেমন তামাক বা পরিবেশবিধ্বংসী পণ্য।

সম্পূরক শুল্কের ব্যবহারে সতর্কতা
আলোচনায় সতর্ক করা হয়, সম্পূরক শুল্ককে সাধারণ রাজস্ব সংগ্রহের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে বাজারে বিকৃতি তৈরি হয়। বরং এই শুল্ক এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত, যাতে তা পণ্যের সামাজিক বা পরিবেশগত ক্ষতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। নির্দিষ্ট হারে কর আরোপ করলে স্বচ্ছতা বাড়ে এবং অপব্যবহার কমে।
বর্তমান আইনের সীমাবদ্ধতা ও সংস্কারের প্রয়োজন
২০১২ সালের ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইনে এখনো কিছু পুরোনো কাঠামো রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। এসব জটিলতা দূর করতে এক ধাপের কর আরোপ ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা, যাতে উৎপাদন বা আমদানি পর্যায়েই কর নির্ধারিত হয়। এতে একই পণ্যে বারবার কর আরোপের সমস্যা কমবে।
ডিজিটাল নজরদারি ও কর ফাঁকি রোধ
কর ফাঁকি কমাতে ডিজিটাল “ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস” ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরবরাহ চেইনে নজরদারি বাড়ানো এবং ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস ব্যবস্থাপনা চালুর কথাও বলা হয়। এতে অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।

পণ্যভিত্তিক কর কাঠামো ও আন্তর্জাতিক অনুশীলন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর নির্দিষ্ট হারে কর আরোপের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। যেমন তামাক, অ্যালকোহল বা জ্বালানির ক্ষেত্রে পরিমাণভিত্তিক কর নির্ধারণ করা হয়। খাদ্য ও পানীয় ক্ষেত্রে চিনির পরিমাণ বিবেচনা করে কর আরোপের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
আঞ্চলিক সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কর হার সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে অবৈধ বাণিজ্য কমবে। একইসঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে কর প্রশাসন আরও শক্তিশালী হবে। তবে যেকোনো পরিবর্তন ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা উচিত, যাতে বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা না লাগে।
অর্থনীতি ও বিনিয়োগে প্রভাব
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, একটি স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল কর কাঠামো বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক। এতে ব্যবসায়ীদের আস্থা তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। একইসঙ্গে ভোক্তার ওপর চাপ কমিয়ে ন্যায্য বাজার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















