যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক পণ্যমূল্যে তীব্র উল্লম্ফন বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে নতুন করে ঝাঁকুনি দিয়েছে। ডাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স (ডেইরা)-এর সাম্প্রতিক নীতিপত্রে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আগে দ্রুত আর্থিক ও মুদ্রানীতিতে সমন্বয় জরুরি হয়ে উঠেছে।
পণ্যমূল্যের ধাক্কা ও অর্থনৈতিক চাপ
নীতিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চে সংঘাত শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩.৬৯ ডলারে পৌঁছায়, যা প্রায় ৪৫.৮ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সময়ে ইউরিয়া সারের দাম বেড়ে মেট্রিক টনপ্রতি ৭২৫.৬৩ ডলারে দাঁড়ায়, অর্থাৎ ৭৪.৭ শতাংশ বৃদ্ধি। এর সঙ্গে এক মাসেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে ৯৯৩ মিলিয়ন ডলার।
এই ধাক্কার আগে থেকেই অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় ছিল। ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৩.০৩ শতাংশে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার ১০ শতাংশে স্থির থাকায় প্রকৃত সুদহার প্রায় ১.২৯ শতাংশে নেমে আসে।
ত্রিমুখী সংকটে নীতিনির্ধারকদের চ্যালেঞ্জ
ডেইরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন এক ধরনের ‘ত্রিমুখী সংকটে’ আটকে পড়েছে। একদিকে রিজার্ভ রক্ষা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং একই সঙ্গে নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হচ্ছে সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেই।
তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে মূল্যস্ফীতি ১২ থেকে ১৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, এলএনজি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সারের দাম বাড়ার ফলে খাদ্যদ্রব্যের ওপর প্রভাব—এই তিনটি কারণ মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। তবে সুদের হার আরও বাড়ালে বেসরকারি ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও শ্লথ হতে পারে।

রিজার্ভে চাপ ও বাজেটে বাড়তি বোঝা
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩৫.১ বিলিয়নে উঠলেও রিজার্ভ আবার চাপে পড়েছে। বর্তমান হারে রিজার্ভ কমতে থাকলে ছয় থেকে নয় মাসের মধ্যে তা ২৮ থেকে ৩০ বিলিয়নে নেমে আসতে পারে, যা আমদানি ব্যয়ের তিন মাসের সমপর্যায়ের ঝুঁকিপূর্ণ সীমার কাছাকাছি।
নীতিপত্রে বলা হয়েছে, এই সংঘাতজনিত ধাক্কা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত ৮৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর পেছনে জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ খাতে লোকসান, সারের ভর্তুকি এবং খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা কাজ করবে।
স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয়
স্বল্পমেয়াদে সুদের হার ১০ শতাংশে ধরে রাখার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশ ছাড়ালে তা ১০.৫০ শতাংশে বাড়ানোর প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ৩০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ সীমা ধরে রাখতে লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ, আন্তর্জাতিক ঋণ সহায়তা দ্রুত গ্রহণ এবং উন্নয়ন কর্মসূচি কিছুটা সীমিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে সংস্কার, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি সরাসরি সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৪৫ দিনের কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সুপারিশও রয়েছে।
ঝুঁকির সতর্ক সংকেত
নীতিনির্ধারকদের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত চিহ্নিত করা হয়েছে—রিজার্ভ ৩০ বিলিয়নের নিচে নেমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশ ছাড়ানো এবং ডলারের বিপরীতে বিনিময় হার ১২৫ টাকা অতিক্রম করা। এসব ঘটলে দ্রুত নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
নীতিপত্রে উপসংহারে বলা হয়েছে, আগামী বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে আর্থিক শৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ভবিষ্যতের ধাক্কা মোকাবিলায় জ্বালানি ভর্তুকি কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে, বাজেটে শৃঙ্খলা ও নীতিগত সমন্বয়ের তাগিদ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















