কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের সাম্প্রতিক উত্থানকে যদি একটি বিশাল স্বর্ণখনি ধরা হয়, তাহলে জাপানের প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী মাসায়োশি সন সেই খনির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী জুয়াড়িদের একজন। তিনি এমন সময়ে বাজি ধরেন, যখন অন্যরা তখনও দ্বিধায় থাকে। কখনও সেই ঝুঁকি তাকে আকাশচুম্বী সাফল্য দিয়েছে, যেমন আর্ম হোল্ডিংস; আবার কখনও উইওয়ার্কের মতো ব্যর্থতা তার কৌশল নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। ওপেনএআইতে তার বিপুল বিনিয়োগ এখন ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
কাগজে-কলমে সফটব্যাংকের লাভ বিশাল। ওপেনএআইয়ের মূল্যায়ন দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিটির অংশীদার হিসেবে সফটব্যাংকের সম্পদের মূল্যও ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। কিন্তু প্রযুক্তি বাজারে কাগুজে লাভ আর বাস্তব নগদ শক্তি এক বিষয় নয়। আর এখানেই সফটব্যাংকের নতুন সংকট।
এআই দুনিয়ায় কেন্দ্র বদলে যাচ্ছে
একসময় মনে হচ্ছিল, ভবিষ্যতের পুরো এআই অর্থনীতি কয়েকটি ভাষা মডেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে। ওপেনএআই সেই দৌড়ে ছিল সবচেয়ে আলোচিত নাম। কিন্তু প্রযুক্তি বাজার খুব দ্রুত নতুন কেন্দ্র খুঁজে নেয়। এখন বিনিয়োগকারীদের চোখ ধীরে ধীরে সরছে সফটওয়্যার মডেল নির্মাতাদের কাছ থেকে হার্ডওয়্যার ও চিপ নির্মাতাদের দিকে।

কারণ সহজ। এআই চালাতে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি দরকার। সেই শক্তির ভিত্তি গড়ে দেয় চিপ নির্মাতারা। ফলে আর্ম, এনভিডিয়া কিংবা অন্যান্য সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর মূল্য এখন বিস্ফোরক গতিতে বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা বুঝতে শুরু করেছেন, কেবল মডেল তৈরি করলেই হবে না; সেই মডেল চালানোর অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় সফটব্যাংকের ওপেনএআই-কেন্দ্রিক কৌশল আগের মতো অপ্রতিরোধ্য দেখাচ্ছে না। বরং আর্মে তাদের পুরনো বিনিয়োগ এখন অনেক বেশি স্থিতিশীল ও কার্যকর বলে মনে হচ্ছে।
তারল্যের সংকট ও ঋণনির্ভর কৌশল
মাসায়োশি সনের ব্যবসায়িক দর্শনের কেন্দ্রে সবসময় লিভারেজ বা ঋণভিত্তিক বিস্তার ছিল। তিনি সম্পদের মূল্য বাড়িয়ে সেই সম্পদকে জামানত রেখে আরও অর্থ সংগ্রহ করেন, তারপর নতুন বিনিয়োগে ঝাঁপ দেন। এই পদ্ধতি তখনই কাজ করে, যখন সম্পদ সহজে নগদায়নযোগ্য হয়।
কিন্তু ওপেনএআইয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, এটি এখনও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। বাজারে এর শেয়ার কেনাবেচা হয় না। ফলে সফটব্যাংকের হাতে থাকা অংশীদারিত্বের মূল্য যতই বাড়ুক, তা থেকে দ্রুত নগদ অর্থ তোলা কঠিন। এ কারণেই ওপেনএআইয়ের শেয়ারকে জামানত রেখে সফটব্যাংককে তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে।

অন্যদিকে আর্মের মতো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সুবিধা হলো, সেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শেয়ার লেনদেন হয়। দরকার হলে দ্রুত শেয়ার বিক্রি করা যায় কিংবা সহজ শর্তে ঋণ তোলা যায়। অর্থাৎ তারল্যের দিক থেকে আর্ম অনেক বেশি নিরাপদ সম্পদ।
এই পার্থক্য এখন সফটব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ উচ্চমূল্যের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বড় বিনিয়োগ করা যতটা সহজ, সেই বিনিয়োগ থেকে কার্যকর নগদ প্রবাহ তৈরি করা ততটা সহজ নয়।
ওপেনএআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে সংশয়
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো প্রতিযোগিতা। ওপেনএআই এখনও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কিন্তু বাজারে আর একক আধিপত্য নেই। অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি দ্রুত উঠে আসছে। নিরাপত্তা, কোড বিশ্লেষণ ও বিশেষায়িত এআই সেবায় তারা নতুন আগ্রহ তৈরি করছে।
একই সময়ে ওপেনএআইয়ের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার খবর, লোকসানী ইউনিট আলাদা করার আলোচনা—এসব ইঙ্গিত দেয় যে প্রতিষ্ঠানটি এখনও স্থিতিশীল ব্যবসায়িক মডেলে পৌঁছাতে পারেনি।

এ অবস্থায় সফটব্যাংক নিজেও যেন কৌশল বদলের সংকেত দিচ্ছে। তারা এখন “ফিজিক্যাল এআই” বা রোবটিক্স ও অবকাঠামোভিত্তিক এআই কোম্পানি তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। নতুন প্রতিষ্ঠান “রোজ”কে মার্কিন বাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনাও সেই পরিবর্তনের অংশ।
এতে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়: সফটব্যাংক বুঝতে পারছে, এআইয়ের পরবর্তী ধাপ কেবল চ্যাটবট বা ভাষা মডেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাস্তব দুনিয়ার যন্ত্র, ডেটা সেন্টার, চিপ এবং স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমই হবে আগামী প্রতিযোগিতার কেন্দ্র।
মাসায়োশি সনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ভবিষ্যৎ আগেভাগে চিনতে পারা। কিন্তু প্রযুক্তির ইতিহাস বলছে, ভবিষ্যৎকে খুব দ্রুত আঁকড়ে ধরতে গিয়েও অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা পুরনো হয়ে পড়েন। ওপেনএআই নিয়ে সফটব্যাংকের বর্তমান অবস্থান সেই বাস্তবতারই একটি নতুন উদাহরণ।
শুলি রেন 



















