হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কয়েকদিনের উত্তেজনা ও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের পর শনিবার পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত বন্ধ এবং আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনার সূচনা নিয়ে ওয়াশিংটনের নতুন প্রস্তাবের জবাব এখনো দেয়নি তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার জানিয়েছিলেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেতে পারে। তবে একদিন পেরিয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতির ইঙ্গিত মেলেনি। প্রস্তাবটির লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করা এবং পরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করা।
চীনে ট্রাম্পের সফরের আগে চাপ
আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল প্রতীক্ষিত চীন সফর ঘিরে এই সংকট দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার চাপ বাড়ছে। কারণ চলমান সংঘাত ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
এক মাস আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনাগুলো ঘটেছে। শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাতও নতুন করে হামলার মুখে পড়ে।
হরমুজে উত্তেজনা ও সামরিক সংঘর্ষ
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, শুক্রবার প্রণালিতে ইরানি বাহিনী ও মার্কিন নৌযানের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হয়েছে। পরে তাসনিম সংবাদ সংস্থা ইরানের এক সামরিক সূত্রের বরাতে জানায়, পরিস্থিতি আপাতত শান্ত হলেও নতুন সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, ইরানের একটি বন্দরে প্রবেশের চেষ্টা করা ইরান-সংযুক্ত দুটি জাহাজে তারা হামলা চালায়। মার্কিন যুদ্ধবিমান জাহাজ দুটির ধোঁয়া নির্গমন অংশে আঘাত করলে সেগুলো পিছু হটতে বাধ্য হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান মূলত হরমুজ প্রণালিতে অ-ইরানি জাহাজ চলাচল সীমিত করে রেখেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে। তবে একটি মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ আরোপ করলেও অন্তত চার মাস পর্যন্ত তেহরান তীব্র অর্থনৈতিক চাপে পড়বে না। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এক জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ওই মূল্যায়ন নিয়ে প্রকাশিত কিছু দাবি অস্বীকার করেছেন।
আমিরাতে হামলা ও আঞ্চলিক উদ্বেগ
সংঘর্ষ শুধু হরমুজ প্রণালিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, শুক্রবার ইরান থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও তিনটি ড্রোন প্রতিহত করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এতে তিনজন মাঝারি ধরনের আহত হয়েছেন।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে। আমিরাতের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প “প্রজেক্ট ফ্রিডম” নামে হরমুজে জাহাজ নিরাপত্তা উদ্যোগ ঘোষণার পর ইরান এই সপ্তাহে হামলা আরও বাড়িয়ে দেয়। যদিও ৪৮ ঘণ্টা পর সেই উদ্যোগ স্থগিত করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প বৃহস্পতিবার দাবি করেন, ৭ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে। তবে ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি শুক্রবার বলেন, “যখনই কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়, তখনই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানের পথ বেছে নেয়।”
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ
চলমান সংঘাতে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি সফল হয়নি। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কো রুবিও প্রশ্ন তোলেন, কেন ইতালিসহ মিত্র দেশগুলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার মার্কিন উদ্যোগকে জোরালোভাবে সমর্থন দিচ্ছে না।
অন্যদিকে স্টকহোমে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্জ বলেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোও চায় ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। একই সঙ্গে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে মতপার্থক্য কমানোর চেষ্টা করছে।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গভীর সংকট এখনো কাটেনি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যে কোনো সময় আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















