দেশজুড়ে হাম প্রাদুর্ভাবে শত শত শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারপ্রতি ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে হাম পরিস্থিতির কারণ অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা ইউনিট স্থাপন এবং টিকার মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতির বিস্তারিত তথ্য আদালতে দাখিলের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
রোববার মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লবসহ অন্যরা এই রিট আবেদন করেন। বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের অনুমতি নিয়ে রিটটি দাখিল করা হয়।
রিটে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং আইইডিসিআরের পরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে।
গণস্বাস্থ্য সংকটের অভিযোগ
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত ৩৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।
আবেদনে দাবি করা হয়, এই মৃত্যুগুলো আকস্মিক বা অনিবার্য ছিল না। বরং টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নীতিগত পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের কার্যকর ব্যবস্থার ব্যাঘাত, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কতা উপেক্ষা এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর অভাব এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
ইউনিসেফের সতর্কবার্তা উপেক্ষার অভিযোগ
রিটে বলা হয়, আগে ইউনিসেফের মাধ্যমে পরিচালিত টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে অন্তর্বর্তী সরকার উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালুর পর হামের টিকা সরবরাহে গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এর ফলে টিকাদান কর্মসূচিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আবেদনে আরও বলা হয়, ইউনিসেফ বারবার তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে সম্ভাব্য টিকা সংকট, রোগের বিস্তার এবং শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে আমলে নেওয়া হয়নি।

চিকিৎসা অবকাঠামোর সংকট
রিটে জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আইসিইউ, পিআইসিইউ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, অনেক পরিবার এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটেও শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় আইসিইউ বা পিআইসিইউ শয্যা পায়নি। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসিইউ, পিআইসিইউ এবং প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয় সুবিধাসহ বিশেষায়িত হাম চিকিৎসা ইউনিট গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
তদন্ত কমিটি ও টিকা ব্যবস্থার তথ্য চাওয়া
রিটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং আইইডিসিআরের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১০ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের আবেদন জানানো হয়েছে। এই কমিটিকে হাম প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দায়ীদের চিহ্নিত করে ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া হাম ও জলাতঙ্কের টিকার বর্তমান মজুত, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার অবস্থা সম্পর্কে সাত দিনের মধ্যে হলফনামা আকারে আদালতে তথ্য দাখিলের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ৫ মে এ বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় এবং হাম পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও অবনতির দিকে যাওয়ায় জনস্বার্থে এই রিট দায়ের করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















