ইন্দোনেশিয়া গত তিন বছরে একটি পূর্ণাঙ্গ কার্বন বাণিজ্য ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে। প্রেসিডেন্টের বিধান, বাস্তবায়ন কাঠামো, জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা, কার্বন এক্সচেঞ্জ—সবই তৈরি হয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি জলবায়ু নীতির একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কম আশাব্যঞ্জক। এই বাজার এখনো এমন কোনো কার্যকর কার্বন মূল্য তৈরি করতে পারেনি, যা শিল্পখাতকে দূষণ কমাতে বাধ্য করবে।
সমস্যাটি প্রযুক্তিগত নয়, বরং নীতির গভীরে। ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান কার্বন বাজার এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে বড় দূষণকারী শিল্পগুলোকে চাপের মুখে না পড়তে হয়। ফলে বাজার আছে, লেনদেনও আছে, কিন্তু আচরণগত পরিবর্তন নেই।
কার্বন বাণিজ্যের মূল দর্শন হলো দূষণকে ব্যয়বহুল করে তোলা। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন যদি বেশি খরচের হয়ে ওঠে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই শিল্পখাত সৌর, বায়ু বা জলবিদ্যুতের মতো বিকল্পের দিকে ঝুঁকবে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ায় সেই অর্থনৈতিক চাপ কার্যত অনুপস্থিত। কার্বনের দাম এত কম যে এটি দূষণ কমানোর কোনো বাস্তব প্রণোদনা তৈরি করছে না।
এর অন্যতম কারণ হলো নির্গমন সীমা নির্ধারণের পদ্ধতি। সরকার মোট নির্গমনের ওপর কঠোর সীমা আরোপ না করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপরীতে নির্গমন হিসাব করছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে মোট কার্বন নিঃসরণও বাড়ছে, যদিও কেন্দ্রগুলো কাগজে-কলমে নির্ধারিত মান পূরণ করছে। অর্থাৎ, নিয়ম মেনে চললেও সামগ্রিক দূষণ কমছে না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিনামূল্যে নির্গমন অনুমতি বিতরণ। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে এমনভাবে কার্বন ইউনিট দেওয়া হচ্ছে যাতে তাদের অতিরিক্ত ইউনিট কেনার প্রয়োজন না পড়ে। বাজারে যখন সংকট নেই, তখন কেন প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করবে? ফলাফল হিসেবে উন্মুক্ত বাজারে প্রকৃত লেনদেন প্রায় নেই বললেই চলে। অধিকাংশ লেনদেন হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে, যা স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণকে দুর্বল করছে।
সরকারের যুক্তি হলো, শিল্পখাতকে ধীরে ধীরে নতুন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত করতে হবে। হঠাৎ কঠোর নিয়ম আরোপ করলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু এই ধীর রূপান্তর শেষ পর্যন্ত পুরোনো দূষণকারী শিল্পগুলোকেই সুবিধা দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো পরিণত কার্বন বাজারগুলোও শুরুতে একই পথ নিয়েছিল, কিন্তু পরে ধাপে ধাপে নিলামভিত্তিক ব্যবস্থায় চলে যায়। ইন্দোনেশিয়া এখনো সেই পরিবর্তনের স্পষ্ট রূপরেখা দেয়নি।
এই ব্যবস্থার কারণে বাজারে বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত কার্বন ইউনিট জমে আছে। প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ইউনিট কেনার বদলে আগের সঞ্চিত ইউনিট ব্যবহার করছে। এর মানে হলো বাজারে প্রকৃত চাহিদা তৈরি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কার্বনের দাম কখনোই যথেষ্ট উচ্চতায় পৌঁছাবে না।
কার্বনের বর্তমান মূল্যও সমস্যার গভীরতা তুলে ধরে। প্রতি টন কার্বনের দাম তিন ডলারের নিচে থাকলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে কয়লার প্রতিযোগিতা অসম্ভব। গবেষণা বলছে, ইন্দোনেশিয়ায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে কার্বনের প্রকৃত পরিবেশগত খরচকে অর্থনৈতিকভাবে দৃশ্যমান করতে হবে। বর্তমান কাঠামো সেটি করতে পারছে না।

এখানে আরও একটি বিতর্কিত দিক হলো অফসেট প্রকল্প ও বায়োমাস সহ-দহন। সরকার এগুলোকে নির্গমন কমানোর বৈধ উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের কার্যকারিতা ও পরিবেশগত সততা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বায়োমাস ব্যবহারের ফলে বনভূমির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। যদি এসব পদ্ধতি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃত বিকল্প হয়ে ওঠে, তাহলে কার্বন বাজারের মূল উদ্দেশ্যই দুর্বল হয়ে পড়বে।
ইন্দোনেশিয়া এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। চলমান নীতিগত সংশোধন যদি কেবল প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও জটিল করে, তাহলে এই বাজার কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু যদি সরকার বাস্তব অর্থে কঠোর নির্গমন সীমা, কার্যকর শাস্তি এবং নিলামভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ চালু করতে পারে, তাহলে এটি জ্বালানি রূপান্তরের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
কার্বন বাজারের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় একটি রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত পুরোনো অর্থনৈতিক সুবিধা ভাঙতে—সেই সাহসই নির্ধারণ করবে এই ব্যবস্থার সাফল্য বা ব্যর্থতা।
রাবিন ড্যানিয়েল 



















