যুক্তরাজ্যে ধনী পরিবারের সন্তানদের জন্য তৈরি হয়েছে এক অভিনব পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, যেখানে শেখানো হয় শুধু অর্থ ব্যবস্থাপনা নয়, বরং জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পাওয়ার উপায়ও। লন্ডনের ব্লুমসবারির একটি জর্জিয়ান টাউনহাউসে বসে তরুণ-তরুণীরা আলোচনা করেন অতিধনী পরিবারের সন্তান হওয়ার চাপ, বিচ্ছিন্নতা ও পরিচয় সংকট নিয়ে।
এই প্রতিষ্ঠানের নাম ড্যালিংটন। এর প্রতিষ্ঠাতা ৩৯ বছর বয়সী জেসিকা ম্যাকগওলি। তিনি জানান, তাদের অনেক ক্লায়েন্টই বহুজাতিক ব্যবসায়ী পরিবার বা প্রথম প্রজন্মের কোটিপতিদের সন্তান। কেউ বড় ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি, কেউ আবার শত শত কোটি টাকার ট্রাস্ট ফান্ডের মালিক। কিন্তু এই বিপুল সম্পদের মধ্যেও তারা ভোগে গভীর অনিশ্চয়তা ও আত্মপরিচয়ের সংকটে।
প্রতিষ্ঠানটির আরেক অংশীদার মনোবিজ্ঞানী ফারাহ খুশাবি ধনী তরুণদের মানসিক অবস্থা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মতে, সমাজে “নেপো বেবি” শব্দটি এখন প্রায় অপমানসূচক হয়ে উঠেছে। ফলে ধনী পরিবারের সন্তানরা নিজেদের সাফল্যকেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। তারা প্রায়ই শুনতে পান—বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বা চাকরি পাওয়ার পেছনে তাদের পরিবারের অর্থ ও প্রভাব কাজ করেছে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাসে আঘাত লাগে এবং অনেকেই নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে চলেন।
২১ বছর বয়সী এমিলিয়া, যিনি এক ধনী একক অভিভাবকের মেয়ে, বলেন যে তিনি আর্থিক চাপ না থাকলেও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলাকে কঠিন মনে করেন। বন্ধু, সহকর্মী কিংবা প্রেমের সম্পর্কে নিজের পারিবারিক বাস্তবতা প্রকাশ করতে তিনি ভয় পান। তার ভাষায়, “মানুষ ধনীদের নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করে। তাই আমি নিজের অনেক দিক লুকিয়ে রাখি।”

২৫ বছর বয়সী হ্যারি জানান, বিশাল ট্রাস্ট ফান্ড থাকায় জীবনে সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেননি। ফলে নিজের দক্ষতা বা লক্ষ্য খুঁজে পেতে তার সময় লেগেছে অনেক বেশি। তিনি বলেন, “আমি জানতাম কাজ না করলেও খাওয়া ও থাকার সমস্যা হবে না। কিন্তু যাদের সেই নিরাপত্তা নেই, তাদের মধ্যে আলাদা এক লড়াইয়ের মানসিকতা থাকে।”
ড্যালিংটনের কাজ শুধু থেরাপি বা পরামর্শে সীমাবদ্ধ নয়। তারা অর্থনৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনা, সুনাম রক্ষা ও দাতব্য কার্যক্রম সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দেয়। অনেক সময় পরিবারগুলোর সঙ্গে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত কাজ করা হয়। বছরে একজন পরিবারের সদস্যের জন্য ফি শুরু হয় প্রায় ৫৫ হাজার পাউন্ড থেকে, আর বিশেষ “রাইজিং জেন” প্রোগ্রামের জন্য খরচ হয় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত। বড় পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে ব্যয় আরও বেশি হয়।
ম্যাকগওলির মতে, অতিধনী পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অর্থ নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা না করা। অনেক সন্তানই জানে না তাদের পরিবারের সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ বা সেই সম্পদ কীভাবে পরিচালিত হয়। তিনি মনে করেন, অর্থ সম্পর্কেও ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা দেওয়া উচিত, ঠিক ভাষা শেখানোর মতো করেই।
২৮ বছর বয়সী হাসান বলেন, পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেওয়ার চাপ তার স্বাধীনতা কমিয়ে দিয়েছে। তিনি হয়তো সেই শিল্পখাতে আগ্রহী নন, কিন্তু পরিবারের ঐতিহ্য ও হাজারো কর্মীর দায়িত্ব তাকে অন্য পথে হাঁটার সুযোগ দেয় না।
বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট একসময় বলেছিলেন, সন্তানদের আজীবনের জন্য বিপুল অর্থ দিয়ে যাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে। ড্যালিংটনের অভিজ্ঞতাও বলছে, সম্পদ যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি মানসিক চাপ ও পরিচয় সংকটও তৈরি করে। আর সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজতেই এখন ধনকুবের পরিবারের সন্তানরা ভিড় করছেন এই বিশেষ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















