ভারতের অর্থনীতি নিয়ে সরকারি প্রচারণা আর বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বহু বছর ধরে ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব দেশকে একটি দ্রুত উত্থানশীল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের নানা সূচক দেখাচ্ছে, অর্থনীতির ভিতরে জমে থাকা দুর্বলতাগুলো এখন আর আড়াল করা যাচ্ছে না। বাজারের অনিশ্চয়তা, বিদেশি বিনিয়োগের হ্রাস, নিয়ন্ত্রণমূলক প্রশাসনিক পরিবেশ, জ্বালানি নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে এক ধরনের অস্বস্তিকর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
এই সংকট কেবল সংখ্যার নয়; এটি নীতিনির্ধারণের চরিত্রগত সমস্যারও প্রতিফলন। সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত এখানেই যে তারা অর্থনীতিকে রাজনৈতিক সাফল্যের পরিপূরক হিসেবে দেখেছে, কিন্তু উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং বাজারের আস্থাকে টেকসইভাবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি।
ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, একদিকে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বাড়ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নীতিগত সীমাবদ্ধতা অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ভারত যেহেতু বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ, তাই এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। রুপির অবমূল্যায়ন শুধু আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে না, এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিদেশি বিনিয়োগের সাম্প্রতিক প্রবণতাও আশাব্যঞ্জক নয়। দীর্ঘদিন ধরে সরকার বিদেশি পুঁজি আকর্ষণের কথা বললেও বাস্তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য পরিবেশ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা এখন শুধু করের হার বা শ্রম ব্যয় দেখেন না; তারা বিচার করেন প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং তদন্ত সংস্থাগুলোর আচরণও। যদি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা অস্বাভাবিক চাপ প্রয়োগ করছে বা নীতির প্রয়োগে স্বচ্ছতা নেই, তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প বাজার খুঁজবেন।

এখানেই বর্তমান শাসনব্যবস্থার একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়। সরকার মুক্তবাজার ও উন্নয়নের ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক মনোভাব আরও শক্তিশালী হয়েছে। কর প্রশাসন, আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাণিজ্য নীতি কিংবা তদন্ত সংস্থাগুলোর আচরণ—সব মিলিয়ে ব্যবসায়ী মহলে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাই বেশি প্রভাব ফেলছে।
এই পরিবেশে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। শিল্পপতিরা তখনই নতুন বিনিয়োগ করেন, যখন তারা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত পান। কিন্তু যদি প্রতিনিয়ত নীতির অনিশ্চয়তা থাকে, তদন্তের ভয় থাকে, বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কারণে বাজারে চাপ তৈরি হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগ কমে যাবে।
অন্যদিকে সরকারের ব্যয়ের ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সাধারণ মানুষকে মিতব্যয়িতার পরামর্শ দেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সেই সংযমের প্রতিফলন খুব বেশি দেখা যায় না। অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে নেতৃত্বের কাছ থেকে মানুষ শুধু আহ্বান নয়, উদাহরণও প্রত্যাশা করে। যখন জনগণকে জ্বালানি ব্যবহার কমাতে বলা হয়, তখন সরকারকেও একই ধরনের সংযমের বার্তা দিতে হয়। নইলে নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভারতের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন করা। এই আস্থা কেবল বক্তৃতা বা নির্বাচনী প্রচারণা দিয়ে ফিরবে না। প্রয়োজন বাস্তব সংস্কার। নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে সহজ করা, কর কাঠামোকে বিনিয়োগবান্ধব করা, তদন্ত সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করা এবং নীতিনির্ধারণে পেশাদার দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া—এসব পদক্ষেপ ছাড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা কঠিন হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতাও এখন অনেক বদলে গেছে। বিশ্বজুড়ে পুঁজি আরও সতর্ক, আরও গতিশীল। বিনিয়োগকারীরা দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলান। ফলে শুধু দেশপ্রেমের ভাষণ বা আত্মনির্ভরতার স্লোগান দিয়ে বিদেশি পুঁজি টেনে রাখা সম্ভব নয়। তাদের প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং স্বচ্ছ প্রশাসন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অর্থনীতিকে রাজনৈতিক অহংকারের প্রকল্পে পরিণত করা বিপজ্জনক। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং নীতিগত স্থিরতার মাধ্যমে। যদি সরকার সমালোচনাকে অস্বীকার করে শুধু প্রচারণায় ব্যস্ত থাকে, তাহলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
ভারতের সামনে এখনও সুযোগ আছে। দেশটির বাজার বড়, তরুণ জনগোষ্ঠী বিশাল, এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাড়ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক আত্মতুষ্টি থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকার করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নের যে গল্প এতদিন বলা হয়েছে, সেটি ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।
পি চিদাম্বরম 



















