একসময় নতুন বইয়ের গন্ধ মানেই ছিল উৎসবের অনুভূতি। শহরের বইপাড়া, মেলার স্টল কিংবা ছোট্ট লাইব্রেরি—সব জায়গায় পাঠকের ভিড় চোখে পড়ত। নতুন উপন্যাস, কবিতার বই কিংবা গবেষণাধর্মী প্রকাশনা হাতে নিয়ে পাঠকের উচ্ছ্বাস ছিল আলাদা। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। বইয়ের দোকানে মানুষের উপস্থিতি কমছে, বিক্রিও নেমে এসেছে উদ্বেগজনক পর্যায়ে।
প্রকাশক, বিক্রেতা এবং লেখকদের মতে, গত কয়েক বছরে বই বিক্রির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের পাঠাভ্যাসে পরিবর্তন, ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তার, অর্থনৈতিক চাপ এবং সাম্প্রতিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে বইয়ের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
মোবাইলের স্ক্রিনে আটকে যাচ্ছে মনোযোগ
বর্তমান সময়ে মানুষের বড় একটি অংশ অবসর কাটাচ্ছে মোবাইল ফোনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শর্ট ভিডিও, ওয়েব সিরিজ এবং অনলাইন গেম মানুষের মনোযোগের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
অনেক প্রকাশকের ভাষ্য, আগে একজন পাঠক মাসে অন্তত দুই বা তিনটি বই কিনতেন। এখন অনেকে পুরো বছরেও একটি বই কেনেন না। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এই পরিবর্তন বেশি চোখে পড়ছে।

শুধু পাঠাভ্যাস নয়, মানুষের ধৈর্যও বদলে গেছে। ছোট ভিডিও বা দ্রুত বিনোদনের যুগে গভীর মনোযোগ দিয়ে একটি বই পড়ার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে সাহিত্যচর্চা যেমন কমছে, তেমনি কমছে চিন্তাশীল পাঠকও।
বাড়ছে খরচ, কমছে বই কেনা
অর্থনৈতিক চাপও বই বিক্রি কমার অন্যতম কারণ। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে অনেক পরিবার এখন প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে দিয়েছে। সেই তালিকায় বইও পড়ে গেছে।
প্রকাশনা শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাগজের দাম, ছাপাখানার খরচ এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বইয়ের দামও বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু পাঠকের ক্রয়ক্ষমতা একইভাবে বাড়েনি। ফলে অনেকেই বই কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার এখন বই কেনাকে বিলাসিতা হিসেবে দেখছে। আগে মাসিক বাজেটে বইয়ের জন্য আলাদা অর্থ রাখা হলেও এখন সেই জায়গা দখল করেছে ইন্টারনেট বিল, মোবাইল খরচ কিংবা অন্যান্য জরুরি ব্যয়।

ছোট প্রকাশনাগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে
বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবে টিকে থাকলেও ছোট প্রকাশকদের অবস্থা আরও কঠিন। নতুন লেখকের বই প্রকাশ করে অনেকেই বিক্রি তুলতে পারছেন না। অনেক দোকানদার জানিয়েছেন, আগের মতো নতুন বইয়ের চালান তুলতে সাহস পান না তারা।
কিছু প্রকাশক বলছেন, এখন একটি বই প্রকাশের পর লাভ তো দূরের কথা, মূল খরচ তুলতেও দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। এতে নতুন লেখকদের সুযোগও কমে যাচ্ছে।
অনেক ছোট প্রকাশনা ইতোমধ্যে অনলাইনভিত্তিক বিক্রিতে চলে গেছে। কেউ কেউ বই প্রকাশ কমিয়ে অন্য ব্যবসায়ও ঝুঁকছেন। এতে বৈচিত্র্যময় সাহিত্যচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বইমেলাও আগের মতো জমছে না
বইমেলা এখনও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিক্রির দিক থেকে আগের জৌলুস নেই বলে মনে করছেন অনেকে। দর্শনার্থী থাকলেও সবাই বই কিনছেন না। অনেকেই ছবি তোলা, ঘোরাঘুরি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার জন্য মেলায় আসছেন।
তবে কিছু জনপ্রিয় লেখকের বই এখনও ভালো বিক্রি হয়। কিন্তু সামগ্রিক বাজারে সেটি বড় পরিবর্তন আনতে পারছে না।
প্রকাশকরা বলছেন, এখন বইমেলায় মানুষের উপস্থিতি বেশি হলেও প্রকৃত ক্রেতার সংখ্যা কম। ফলে মেলার সাংস্কৃতিক আবহ থাকলেও বাণিজ্যিকভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান হতাশ।

সাংস্কৃতিক ভাঙন ও সামাজিক বিভাজনের প্রভাব
সংশ্লিষ্টদের মতে, বই বিক্রি কমে যাওয়ার পেছনে শুধু অর্থনৈতিক সংকট বা ডিজিটাল আসক্তিই দায়ী নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতাও বড় একটি কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যে বিভাজন ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটিও বইয়ের বাজারে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
সাংস্কৃতিক কর্মী, লেখক এবং প্রকাশকদের একাংশের মতে, ওই সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এবং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঘিরে নানা ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও বিরোধিতা সামনে আসে। এতে অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নিজেদের অনিরাপদ ও চাপে অনুভব করতে শুরু করেন।
তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সাহিত্য, নাটক, গান এবং বইয়ের জগৎ মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু যখন সেই জায়গাগুলো নিয়ে সামাজিক সংঘাত তৈরি হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই পাঠক সমাজেও বিভাজন দেখা দেয়।

অনেকে মনে করছেন, এই পরিস্থিতি শুধু সাংস্কৃতিক মানুষদের ভয় পাইয়ে দেয়নি, বরং সমাজের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক কাঠামোকেও দুর্বল করেছে। আগে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিসরে বই পড়া এবং সাংস্কৃতিক চর্চা একটি স্বাভাবিক অভ্যাস ছিল। এখন সেই জায়গায় অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক বিভক্তি এবং সামাজিক উত্তেজনা প্রভাব ফেলছে।
কিছু লেখক বলছেন, অনেক পাঠক এখন প্রকাশ্যে নির্দিষ্ট ধরনের বই কিনতেও অস্বস্তি বোধ করেন। আবার কিছু সাংস্কৃতিক আয়োজনও আগের মতো প্রাণবন্ত নেই। ফলে সামগ্রিকভাবে পাঠক, লেখক এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মধ্যে যে স্বাভাবিক সংযোগ ছিল, সেটি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
প্রযুক্তি কি বইয়ের শত্রু?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি নিজে বইয়ের শত্রু নয়। বরং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই নতুন প্রজন্মকে বইয়ের দিকে ফেরানো সম্ভব। ই-বুক, অডিওবুক, অনলাইন পাঠচক্র কিংবা ডিজিটাল লাইব্রেরি নতুন ধরনের পাঠক তৈরি করতে পারে।
তবে এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ। শুধু বই প্রকাশ করলেই হবে না, পাঠকের সঙ্গে নতুনভাবে যোগাযোগ তৈরি করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও বই প্রচারের বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলছেন অনেকে।
পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনার দাবি

সাহিত্যপ্রেমী এবং শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাঠাভ্যাস তৈরির উদ্যোগ বাড়াতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বইয়ের সঙ্গে পরিচিত করানো জরুরি। পাশাপাশি লাইব্রেরি সংস্কৃতি শক্তিশালী করা এবং বইয়ের দাম নাগালের মধ্যে রাখার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বইয়ের বাজারকে আবার শক্তিশালী করতে হলে শুধু অর্থনৈতিক সমাধান যথেষ্ট নয়। সমাজে মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ, ইতিহাসচর্চার নিরাপদ ক্ষেত্র এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি দেশের বইয়ের বাজার আসলে সেই দেশের মানসিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থারই প্রতিফলন।
সংস্কৃতির নীরব সংকেত
বই বিক্রি কমে যাওয়া শুধু একটি ব্যবসায়িক সংকট নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত। বই মানুষের চিন্তা, কল্পনা এবং বোধ তৈরির অন্যতম মাধ্যম। তাই পাঠক কমে যাওয়া মানে সমাজের বৌদ্ধিক চর্চাও দুর্বল হয়ে পড়া।
প্রকাশনা জগতের অনেকেই বলছেন, পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি হতাশার নয়। সঠিক উদ্যোগ, নতুন ধরনের প্রচার এবং পাঠকের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো গেলে বই আবারও মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
#বই #বইবিক্রি #প্রকাশনা #পাঠাভ্যাস #সংস্কৃতি #মুক্তিযুদ্ধ #১৯৭১ #জুলাইআন্দোলন #বাংলাসাহিত্য #সাংস্কৃতিকসংকট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















