চীনের সস্তা ও বিপুল পরিমাণ পণ্যে ইউরোপের বাজার ভরে যাওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য সংঘাতের আশঙ্কা দ্রুত বাড়ছে। ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের একাংশ এখন মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যদিকে চীনও ইউরোপের উদ্বেগকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে দুই পক্ষের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত পুরো বাণিজ্য কাঠামোকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
ইউরোপে বাড়ছে উদ্বেগ
ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, চীনের রাষ্ট্র-সমর্থিত শিল্পনীতি ইউরোপের গাড়ি, ইস্পাত ও প্রযুক্তি খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধীরে ধীরে চীনের জন্য কঠিন হয়ে ওঠায় বেইজিং এখন ইউরোপের বাজারে আরও বেশি পণ্য পাঠাচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ইউরো বাণিজ্য ঘাটতি চীনের পক্ষে যাচ্ছে। ইউরোপীয় নেতারা বারবার বেইজিংকে ভারসাম্য আনার আহ্বান জানালেও তাতে খুব একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

চীনের দৃষ্টিতে দুর্বল ইউরোপ
চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব ইউরোপকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল মনে করে। কারণ ২৭টি সদস্য দেশের ঐকমত্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ইউরোপের জন্য কঠিন।
চীনা কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইউরোপ অতিরিক্তভাবে মূল্যবোধ ও নীতির প্রশ্ন তোলে, অথচ বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থে আরও বাস্তববাদী হওয়া উচিত। একই সঙ্গে বেইজিং আলাদা আলাদা ইউরোপীয় দেশকে কাছে টানার কৌশলও নিচ্ছে। বিশেষ করে স্পেনের মতো দেশকে তারা “বাস্তববাদী অংশীদার” হিসেবে তুলে ধরছে।
কঠোর নীতির প্রস্তুতি ব্রাসেলসে
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন নতুন বাণিজ্য সুরক্ষা নীতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রাসেলসের প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও কৌশলগত শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কঠোর শর্ত আরোপ করা হতে পারে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ করতে চাইলে বিদেশি কোম্পানিকে স্থানীয় শ্রমিক নিয়োগ বাড়াতে হবে, ইউরোপে তৈরি যন্ত্রাংশ ব্যবহার করতে হবে এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়েও সহযোগিতা করতে হবে। পাশাপাশি বড় সরকারি প্রকল্পে “ইউরোপীয় পণ্য ব্যবহারের” শর্ত যোগ করার চিন্তাও চলছে।

চীনের পাল্টা হুঁশিয়ারি
চীন ইতোমধ্যে এসব প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছে। বেইজিংয়ের মতে, ইউরোপ এখন সেই একই কৌশল ব্যবহার করতে চাইছে, যা একসময় চীন পশ্চিমা কোম্পানির ওপর প্রয়োগ করেছিল।
চীনা শিল্পমহলের অনেকে ইউরোপকে উদ্ভাবনে পিছিয়ে পড়া এবং অতিরিক্ত সুরক্ষাবাদী বলেও সমালোচনা করছেন। তবে ইউরোপে শিল্প ও কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়লে রাজনৈতিক চাপ যে আরও বাড়বে, সেটিও তারা বুঝতে পারছে।
শিল্প রক্ষা নাকি বাণিজ্য যুদ্ধ
ইইউর বাণিজ্য কমিশনার মারোস শেফচোভিচ সতর্ক করে বলেছেন, চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ইউরোপের জন্য রাশিয়ান জ্বালানির ওপর পুরোনো নির্ভরতার মতো ঝুঁকি তৈরি করছে। তাঁর মতে, ইউরোপ এখনই ব্যবস্থা না নিলে কয়েক বছরের মধ্যেই পুরো শিল্পখাত হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে, বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করা সহজ হলেও তা থামানো অত্যন্ত কঠিন।
ইউরোপের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো নিরাপত্তা। বিশেষ করে চীনা প্রযুক্তিনির্ভর বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সবুজ জ্বালানি সরঞ্জাম ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। এজন্য ইউরোপ এখন প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করার পথ খুঁজছে।
চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে ইউরোপ এখনও দ্বিধায় থাকলেও নিজেদের শিল্প রক্ষায় কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ দেখছে না।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















