কয়েক বছর আগেও প্রযুক্তি বাজারে চাপে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং। বাজার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার কথা স্বীকার করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর চিপের বাড়তি চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে স্যামসাং আবারও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য প্রায় চার গুণ বেড়ে প্রথমবারের মতো এক ট্রিলিয়ন ডলার স্পর্শ করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের পরিচালন মুনাফা পৌঁছেছে ৫৭ ট্রিলিয়ন ওনে, যা আগের বছরের তুলনায় আট গুণেরও বেশি।
চিপ ব্যবসাতেই মূল সাফল্য
স্যামসাংয়ের পণ্যের তালিকায় স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ফ্রিজ পর্যন্ত থাকলেও এখন প্রতিষ্ঠানটির মূল শক্তি হয়ে উঠেছে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ ব্যবসা। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট বিক্রির ৬১ শতাংশ এবং পরিচালন মুনাফার ৯৪ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত উন্নত মেমোরি চিপের বাজারে স্যামসাং এখন অন্যতম প্রধান নাম। বিশ্বের মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান বড় পরিসরে এই ধরনের চিপ উৎপাদন করতে পারে। ফলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির জন্য স্যামসাংয়ের দ্বারস্থ হচ্ছে।
প্রথম প্রান্তিকে চিপ বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ বাড়লেও গড় বিক্রয়মূল্য বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছর পর্যন্ত এই চিপ সংকট ও উচ্চ চাহিদা অব্যাহত থাকতে পারে।
সতর্কভাবে বাড়ছে বিনিয়োগ
বাজারে চাহিদা বাড়লেও স্যামসাং খুব দ্রুত উৎপাদন সম্প্রসারণে যাচ্ছে না। নতুন একটি কারখানা চলতি বছর উৎপাদন শুরু করবে এবং জুলাইয়ে আরও একটি বিশাল প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প পুরোপুরি চালু হতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে।
প্রতিষ্ঠানটির এই সতর্ক অবস্থানের পেছনে রয়েছে অতীতের অভিজ্ঞতা। আগে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছিল তারা। তাই এবার বাজারে চাহিদা বাড়লেও ধীরে এবং হিসাব করে এগোতে চাইছে স্যামসাং।

নতুন সুযোগ পাচ্ছে চুক্তিভিত্তিক চিপ কারখানা
নিজেদের ডিজাইনের বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠানের চিপ উৎপাদনের ব্যবসাও বাড়াচ্ছে স্যামসাং। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নতুন একটি কারখানা এ বছর চালু হবে। এতদিন তাইওয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান টিএসএমসির তুলনায় এই খাতে পিছিয়ে ছিল স্যামসাং।
তবে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির উত্থান স্যামসাংকে নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। টিএসএমসির উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় পূর্ণ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বিকল্প হিসেবে স্যামসাংয়ের দিকে ঝুঁকছে। এর মধ্যে গাড়ি নির্মাতা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
সাফল্যের মধ্যেও নতুন চাপ
চিপ ব্যবসায় বিপুল লাভ এলেও স্যামসাংয়ের অন্যান্য বিভাগে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে স্মার্টফোন ব্যবসায় মুনাফা কমে যাচ্ছে। চলতি বছর এই বিভাগে লোকসানের আশঙ্কাও রয়েছে।

একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ায় রাজনৈতিক বিতর্কও বাড়ছে। সরকারঘনিষ্ঠ মহল থেকে চিপ খাতের অতিরিক্ত মুনাফার একটি অংশ সাধারণ মানুষের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নও মেমোরি চিপ বিভাগের মুনাফার ১৫ শতাংশ কর্মীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার দাবি তুলেছে।
দাবি না মানা হলে মে মাসের শেষ দিকে দীর্ঘমেয়াদি ধর্মঘটের হুমকিও দিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। এতে স্যামসাংয়ের বড় অঙ্কের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর স্যামসাং এখন আবারও প্রযুক্তি বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরেছে। তবে এই সাফল্যের সঙ্গে নতুন ধরনের চাপ এবং চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে, যা সামাল দেওয়াই এখন প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















