দীর্ঘদিন ধরে জাপানকে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থবিরতা, কম প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতিহীন অর্থনীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। এখন দেশটি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে মূল্যস্ফীতি আর কেবল অর্থনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি সরাসরি ভোট রাজনীতি, পারিবারিক ব্যয় এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। তবে এই পরিবর্তনের মাঝেও জাপানের অর্থনীতিকে ধাক্কা থেকে রক্ষা করছে একটি অপ্রত্যাশিত শক্তি—বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বিপুল সঞ্চয়।
প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি বৈপরীত্যপূর্ণ মনে হতে পারে। কারণ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে প্রবীণদের ওপরই। খাদ্যপণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে অবসরপ্রাপ্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। অথচ তাদের আয়, বিশেষ করে সরকারি পেনশন, সেই গতিতে বাড়েনি। জাপানের পেনশন কাঠামো এমনভাবে তৈরি যে তা সচেতনভাবেই মূল্যস্ফীতির চেয়ে কিছুটা ধীরগতিতে সমন্বয় করা হয়। ফলে বাস্তবে প্রবীণদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
কিন্তু অর্থনীতির বড় চিত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন বাস্তবতা। আয়ের ওপর চাপ থাকা সত্ত্বেও বয়স্ক মানুষের ভোগব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা মধ্যবয়সী কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি স্থিতিশীলভাবে খরচ ধরে রেখেছেন। এর পেছনে কাজ করছে কয়েক দশকের সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং ঋণমুক্ত আর্থিক অবস্থান।
জাপানের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এমন সময়ে সম্পদ গড়ে তুলেছে, যখন দেশটি উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুগ পার করছিল। বাড়ির মালিকানা, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত এবং আর্থিক সম্পদ—সব মিলিয়ে তাদের হাতে এখন বিশাল সম্পদভাণ্ডার রয়েছে। ফলে বর্তমান মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দিতে তারা কেবল মাসিক আয়ের ওপর নির্ভর করছেন না; বরং জমে থাকা সম্পদ ব্যবহার করে ব্যয় অব্যাহত রাখছেন।
এই বাস্তবতা জাপানের অর্থনীতিকে এক ধরনের “নরম অবতরণ” নিশ্চিত করেছে। সাধারণত উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও স্থবির মজুরি একসঙ্গে দেখা দিলে ভোক্তা ব্যয় দ্রুত কমে যায়, বাজারে চাহিদা পড়ে যায় এবং অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু জাপানে সেই ধস দেখা যাচ্ছে না। কারণ প্রবীণদের ব্যয় অর্থনীতির নিচের মেঝেটি ধরে রেখেছে।

এখানেই জাপানের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন অর্থনৈতিক চরিত্র বদলে দিয়েছে। এখন দেশটির বড় অংশের পরিবারই ষাটোর্ধ্ব মানুষদের নেতৃত্বে পরিচালিত। এই জনগোষ্ঠী সাধারণ কর্মজীবী মানুষের মতো মাসিক আয়ের ওঠানামায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায় না। ফলে অর্থনীতিতে চরম উত্থান-পতনের ঝুঁকি কমে যায়। এক অর্থে, প্রবীণদের সঞ্চয় অর্থনীতির জন্য শক অ্যাবজরবারের কাজ করছে।
তবে এই স্থিতিশীলতার একটি সীমাবদ্ধতাও আছে। জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করতে চেয়েছে, যেখানে মজুরি বাড়বে, মানুষ বেশি খরচ করবে, ব্যবসা সম্প্রসারণ হবে এবং অর্থনীতি টেকসইভাবে চাঙ্গা হবে। কিন্তু যখন বড় একটি জনগোষ্ঠী মূলত সঞ্চয় ভেঙে ব্যয় চালায়, তখন মজুরি বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ আয় বাড়লেও তার পুরো প্রতিফলন বাজারের চাহিদায় দেখা যায় না।
তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য এটি পুরোপুরি নেতিবাচক পরিস্থিতি নয়। কারণ জাপানের অর্থনীতি এখন আর কেবল চাহিদার ঘাটতির সমস্যায় ভুগছে না; বরং শ্রমিক সংকট, উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং জনসংখ্যা হ্রাসের মতো কাঠামোগত সমস্যাও মূল্যস্ফীতিকে টিকিয়ে রাখছে। ফলে খুব শক্তিশালী ভোক্তা চাহিদা ছাড়াও মূল্যস্ফীতি স্থায়ী হতে পারে।
এই কারণেই জাপানের নীতিনির্ধারকেরা এখন সুদের হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে তুলনামূলক আত্মবিশ্বাসী। তারা জানেন, প্রবীণদের সঞ্চয়ভিত্তিক ব্যয় অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেবে না। একই সঙ্গে শ্রমবাজারের সংকট ও সীমিত উৎপাদন সক্ষমতা মূল্যস্ফীতিকে একেবারে নিভে যেতে দেবে না।
জাপানের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাই শুধু মজুরি ও মূল্যস্ফীতির গল্প নয়; এটি জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামো কীভাবে সামষ্টিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে জাপান যে ধীরে ধীরে নতুন অর্থনৈতিক যুগে প্রবেশ করছে, তার পেছনে কেবল নীতিগত পরিবর্তন নয়, সমাজের বয়সগত পরিবর্তনও সমানভাবে কাজ করছে।
সম্ভবত এই পরিবর্তন খুব দ্রুত প্রবৃদ্ধি এনে দেবে না। কিন্তু এটি জাপানকে এমন এক স্থিতিশীলতা দিচ্ছে, যা অনেক উন্নত অর্থনীতির কাছেই এখন দুর্লভ।
টমোহিরো ওতা 



















