বহু বছর ধরে জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ার পপ সংস্কৃতিতে আধিপত্য ধরে রেখেছিল। বিনোদনকে তারা বৈশ্বিক প্রভাব তৈরির শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্পীরাও নিজেদের আলাদা জায়গা তৈরি করছেন। নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংগীত নিয়ে তারা এমন এক বৈশ্বিক শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাচ্ছেন, যারা আগের চেয়ে সীমান্তের ধারণাকে অনেক কম গুরুত্ব দেয়।
এই পরিবর্তনেরই অংশ ইন্দোনেশিয়ার গার্ল গ্রুপ নো না।
নিউইয়র্কভিত্তিক এশীয় সংগীতকেন্দ্রিক লেবেল 88rising-এর সঙ্গে আত্মপ্রকাশের এক বছর পর এসথার জেরালডিন, বাইলা ফাউরি, ক্রিস্টি গার্ডেনা ও শাজফা “শাজ” আদেসিয়াকে নিয়ে গঠিত এই দলটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন সংগীত তরঙ্গের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে একই ধারা গড়ে তুলছে ফিলিপাইনের বিনী, থাইল্যান্ডের 4EVE এবং মালয়েশিয়ার ডোল্লা।
অনলাইনে ভক্ত ও শিল্পীদের মধ্যে “SEAblings” শব্দটির ব্যবহারও বেড়েছে। “SEA” অর্থ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং “siblings” শব্দের সমন্বয়ে তৈরি এই শব্দটি সীমান্ত পেরিয়ে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক সংহতি ও একসঙ্গে উঠে আসার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

নো না বলছে, এই উত্থান তাদের কাছে খুবই ব্যক্তিগত অনুভূতির।
তাদের ভাষায়, “এত অসাধারণ নারী শিল্পীদের সঙ্গে আমাদের নাম উচ্চারিত হওয়া সত্যিই সম্মানের। আমরা ইন্দোনেশিয়াকে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে গর্বিত। একই সঙ্গে আরও বেশি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় শিল্পীকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেতে দেখা অনুপ্রেরণাদায়ক।”
তারা আরও জানায়, “আমাদের লক্ষ্য সবসময়ই ছিল ইন্দোনেশিয়াকে বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরা এবং এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আমাদের সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে সত্যিকারের ও অর্থবহভাবে উপস্থাপন করা।”
গত এক বছরে সংগীতের পাশাপাশি নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কও আরও দৃঢ় হয়েছে বলে জানায় দলটি। আরঅ্যান্ডবি ও পপের মিশ্রণে তৈরি তাদের গানগুলোতে রয়েছে সমন্বিত নাচ, শক্তিশালী হারমনি ও নিখুঁত কোরিওগ্রাফি।
তাদের সংগীতে প্রভাব রয়েছে ভিক্টোরিয়া মোনে, জ্যানেট জ্যাকসন, ডায়ানা রস এবং ব্রিটিশ গার্ল গ্রুপ FLO-এর।
দলটির সদস্যরা বলেন, “আমরা ভাবিনি গত এক বছরে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি, সেগুলো আমাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে। সবকিছু একসঙ্গে পার করার ফলে আমরা শুধু সহশিল্পী নই, পরিবারের মতো হয়ে উঠেছি।”
২০২৫ সালে আত্মপ্রকাশের পর নো না লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক ও টোকিওতে অনুষ্ঠিত Head in the Clouds উৎসবে অংশ নেয়। তাদের গান কোরিয়ান পপ তারকা জিসু ও রেইয়ের ইনস্টাগ্রাম পোস্টেও জায়গা করে নেয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তাদের গান “Work”-এর নাচভিত্তিক চ্যালেঞ্জও অনলাইনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এতে অংশ নেন দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পী দাইয়ং ও তাইয়ং।

তবে দলটির রসায়ন একদিনে তৈরি হয়নি।
সবচেয়ে কম বয়সী সদস্য শাজ বলেন, “শুরুর দিকে ক্রিস্টিকে দেখে আমি একটু ভয় পেতাম। ও খুব চুপচাপ আর রহস্যময় মনে হতো। পরে বুঝেছি, সে আসলে খুব যত্নশীল।”
নাচের ভিডিওর মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার পর শাজকে দলে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে লম্বক থেকে আসা সবচেয়ে বড় সদস্য ক্রিস্টি ২০১৯ সালের International Dance Asia Competition-এ ডুয়ো বিভাগে তৃতীয় হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, “প্রথম দেখা হওয়ার সময় শাজকে আলাদা মনে হয়েছিল, কারণ আমাদের দুজনেরই নাচের পটভূমি ছিল। তাই শুরুতে ওকে ঘিরে আমি কিছুটা নার্ভাস ছিলাম।”
বাইলা ও এসথারেরও ছিল গানের প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা। তারা যথাক্রমে Indonesian Idol Junior ও Indonesian Idol-এ অংশ নিয়েছিলেন।
বাইলা বলেন, “এসথারকে প্রথমে ভয়ংকর মনে হয়েছিল, কারণ জানতাম সে খুব পরিশ্রমী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ।”
এসথারও একই অনুভূতির কথা জানান।
তার ভাষায়, “বাইলাকে প্রথমে খুব আত্মবিশ্বাসী ও সরাসরি কথা বলা মানুষ মনে হয়েছিল। পরে বুঝেছি, সে খুব আন্তরিক ও উষ্ণ মনের।”
ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্ব ও পটভূমি থাকা সত্ত্বেও চারজনই মনে করেন, তারা শেষ পর্যন্ত “ধাঁধার টুকরোর মতো” একে অপরের সঙ্গে মিলে গেছেন।
নো নার পরিচয়ের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। পোশাক, অলংকার থেকে শুরু করে কোরিওগ্রাফি—সবখানেই তারা স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাব রাখার চেষ্টা করে।
তাদের প্রথম মিউজিক ভিডিওতে বালির বিভিন্ন স্থান দেখানো হয়, যার মধ্যে ছিল বানিউমালা জলপ্রপাত ও বিখ্যাত ধানক্ষেত।
তাদের নাচেও বালিনিজ ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের উপাদান দেখা যায়। বিশেষ করে দ্রুত চোখের নড়াচড়া, নিখুঁত হাতের ভঙ্গি ও কাঁধের মুভমেন্ট।
“Falling in Love” গানের ভিডিওতে এই প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি কোরিওগ্রাফি করেছিলেন সিয়েনা লালাউ, যিনি এর আগে ব্ল্যাকপিংকের লিসা ও বিটিএসের জিনের সঙ্গেও কাজ করেছেন।
পরবর্তী গানগুলোতেও ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যকে আরও বেশি তুলে ধরেছে নো না। যেমন “Work” গানে ব্যবহার করা হয়েছে বালিনিজ গামেলান বাদ্যযন্ত্রের সেং সেং।

অন্যদিকে তাদের নতুন গান “Rollerblade”-এ ইন্দোনেশীয় ভাষা ও সংগীতের ছাপ আরও বেশি। “Jedag jedug, tiga, dua, satu” অংশটি এর উদাহরণ। গানটিতে ড্যাংডাট ছন্দের সঙ্গে রেগেটন ও উচ্চশক্তির পপের মিশ্রণও রয়েছে।
১৭ এপ্রিল প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই “Rollerblade” এক মিলিয়নের বেশি ভিউ অতিক্রম করে।
নো না বলছে, “এটি আমাদের কাছে সবকিছু। আমাদের লক্ষ্য সবসময়ই ছিল ইন্দোনেশিয়াকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা এবং আমাদের সংস্কৃতিকে সত্যিকারেরভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।”
বিশ্ব পপ সংগীত ক্রমেই একই ধরনের ধাঁচে চলে যাওয়ায় নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রাখা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংগীত বিশ্লেষকেরা এই প্রবণতাকে “progressive homogenization” বলে উল্লেখ করেন, যেখানে স্ট্রিমিং বাড়ানোর জন্য একই ধরনের প্রযোজনা কৌশল ব্যবহার করা হয়।
এ বিষয়ে নো না বলছে, “আমরা শিল্পী হিসেবে নিজেদের পরিচয় নিয়ে খুব সচেতন। একই সঙ্গে আমরা জানি, এই শিল্পে টিকে থাকতে হলে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়।”
তারা আরও জানায়, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই যাত্রায় নিজেদের হারিয়ে না ফেলা। আমরা চাই নো না সবসময় আমাদের বাস্তব পরিচয়ের প্রতিফলন হোক। আমাদের সংগীত, ভিজ্যুয়াল, স্টাইলিং ও গল্প বলার মধ্য দিয়ে ইন্দোনেশিয়া সবসময়ই আমাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে থাকবে।”
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংগীত বাজার এখনো বৈশ্বিক শিল্পের তুলনায় ছোট হলেও এর প্রবৃদ্ধি দ্রুত।
AXEAN Festival-এর তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের সংগীত বাজারের মূল্য প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক ৮০ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারের সংগীত শিল্পের প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ।
তবে সরাসরি পরিবেশনা ও রেকর্ডকৃত সংগীতের প্রবৃদ্ধিতে ASEAN দেশগুলো বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। স্ট্রিমিং পরিসংখ্যানও দেখাচ্ছে, অঞ্চলটির জনপ্রিয়তা কত দ্রুত বাড়ছে।
Spotify স্ট্রিমিংয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শীর্ষে আছেন ইন্দোনেশীয় গায়িকা নিকি, যার স্ট্রিম সংখ্যা ৬ দশমিক ০৬ বিলিয়ন। এরপর রয়েছেন ব্ল্যাকপিংকের থাই তারকা লিসা, যার ৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন স্ট্রিম। তৃতীয় স্থানে আছেন ইন্দোনেশিয়ার টুলুস।
শীর্ষ দশে সাতজন শিল্পীই ইন্দোনেশিয়ার। তাদের মধ্যে রয়েছেন হিন্দিয়া, রিচ ব্রায়ান ও নাদিন আমিজাহ। এছাড়া মাহালিনি ও তিয়ারা আন্দিনিও ২ দশমিক ৭ বিলিয়নের বেশি স্ট্রিম অর্জন করেছেন।
ফিলিপাইনের দুই শিল্পী জ্যাক টাবুডলো ও মোইরা ডেলা তোরেও আঞ্চলিক শীর্ষ দশে জায়গা করে নিয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্পীরা আর শুধু ছোট পরিসরের রপ্তানি পণ্য নন। তারা এখন এমন শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করছেন, যারা বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম, অথচ নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
নো না এবং তাদের সহযাত্রী SEAblings-দের লক্ষ্যও তাই সহজ—আরও বড় স্বপ্ন দেখা, আর সেই যাত্রায় পুরো অঞ্চলকে সঙ্গে নেওয়া।
ইওহানা বেলিন্দা 



















