প্রযুক্তির বিস্ফোরণ মানুষকে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মুহূর্তে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু একই সময়ে মানুষ যেন আরও একা হয়ে পড়েছে। চারপাশে যোগাযোগের অসংখ্য মাধ্যম থাকলেও সম্পর্কের গভীরতা কমছে, কথোপকথনের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, আর সমাজ ক্রমশ ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দ্বীপে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। আধুনিক সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো অর্থনীতি, যুদ্ধ বা জলবায়ু নয়—বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ হারিয়ে ফেলা।
ব্রিটিশ নাট্যকার জেমস গ্রাহাম এই সংকটকে দেখছেন এক ধরনের “কানেক্টিভিটি ক্রাইসিস” হিসেবে। তাঁর যুক্তি শুধু প্রযুক্তির সমালোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি দেখাতে চান, কেন আধুনিক সমাজের ভাঙন মূলত সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয়ের ফল। মানুষের মধ্যে আলাপ, মতবিনিময়, দ্বিমত ও সহমর্মিতার জায়গা যত সংকুচিত হচ্ছে, ততই বাড়ছে ক্ষোভ, একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা।
আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক মেরুকরণ কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়, এটি সামাজিক বাস্তবতা। মানুষকে ধর্ম, জাতি, শ্রেণি, অঞ্চল কিংবা মতাদর্শের ছোট ছোট খোপে বিভক্ত করা হচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোও এই বিভাজনকে আরও তীব্র করছে। কারণ অ্যালগরিদমের অর্থনীতি সহমর্মিতার চেয়ে উত্তেজনা ও ক্ষোভকে বেশি পুরস্কৃত করে। মানুষ যত রাগান্বিত হয়, তত বেশি সময় স্ক্রিনে কাটায়; আর সেটিই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক সাফল্যের ভিত্তি।
এই পরিস্থিতিতে সমাজের ভেতরে এক ধরনের নীরব ভাঙন তৈরি হয়েছে। একসময় পরিবার, পাড়া, কমিউনিটি সেন্টার কিংবা স্থানীয় আড্ডা মানুষের সম্পর্কের প্রাকৃতিক অবকাঠামো তৈরি করত। এখন সেই জায়গাগুলোর অনেকটাই হারিয়ে গেছে। শহরের ভাঙা সামাজিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য একসঙ্গে মানুষকে আরও একা করে তুলেছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একাকিত্বের মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। একসময় একাকিত্বকে বৃদ্ধ বয়সের সমস্যা হিসেবে দেখা হতো; এখন সেটি তরুণদের মধ্যেও মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

গ্রাহাম যে বিষয়টি সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করেন, তা হলো মানুষের প্রকৃত আলাপের অভাব। তাঁর মতে, শিল্প, নাটক কিংবা গল্প বলার উদ্দেশ্য মানুষকে উপদেশ দেওয়া নয়; বরং আলো নিভে যাওয়ার পর আলোচনার জন্ম দেওয়া। অর্থাৎ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষকে আবার একে অপরের মুখোমুখি বসানো। সমাজে সুস্থ বিতর্ক, পারিবারিক কথোপকথন কিংবা ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা ছাড়া গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানেই তিনি “ন্যাশনাল কনভারসেশন” ধরনের উদ্যোগের গুরুত্ব দেখছেন। ধারণাটি আপাতদৃষ্টিতে প্রতীকী মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরে একটি গভীর সামাজিক প্রয়োজন রয়েছে—মানুষকে আবার কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া। মানুষ যেন নিজেদের আশা, হতাশা, ভয় এবং স্বপ্ন নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারে। এমনকি এমন কথাও, যা শুনতে অস্বস্তিকর। কারণ সৎ কথোপকথন ছাড়া প্রকৃত সামাজিক পুনর্গঠন সম্ভব নয়।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি ঐকমত্য চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা নয়। বরং ভিন্নতার মধ্যেও কোথায় মানুষের মিল রয়েছে, সেটি খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা। সমাজে মতভেদ থাকবে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকবে, কিন্তু তার মধ্যেও যদি একটি সাধারণ মানবিক ভিত্তি টিকে থাকে, তবে ভাঙনের মধ্যেও পুনর্গঠনের সম্ভাবনা থাকে।
সম্ভবত এই কারণেই গ্রাহাম এখনও আশাবাদী। তিনি দেখেন, মানুষ এখনও সংযোগ চায়। হয়তো সেই চাহিদাই মানুষকে এআই চ্যাটবটের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে ঠেলে দিচ্ছে, কিংবা ভাঙা শহরের খালি দোকানে ছোট কমিউনিটি পাব গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করছে। অর্থাৎ মানুষের ভেতরে অন্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা এখনও মরে যায়নি।
আধুনিক সমাজের বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমরা প্রযুক্তিগতভাবে যত বেশি সংযুক্ত হয়েছি, আবেগগতভাবে তত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়েছি। কিন্তু এই বাস্তবতা অপরিবর্তনীয় নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের আলাপ, শোনা এবং বোঝার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা গেলে সামাজিক আস্থাও ফিরতে পারে। রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি তাই প্রয়োজন সামাজিক পুনঃসংযোগের উদ্যোগ।
কারণ শেষ পর্যন্ত সভ্যতার স্থায়িত্ব নির্ভর করে কেবল অর্থনীতি বা অবকাঠামোর ওপর নয়, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও। সমাজ যদি ভাঙা সম্পর্কের সমষ্টিতে পরিণত হয়, তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতিও সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। আর সেই কারণেই আজকের সময়ে সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক বা সামাজিক কাজ হতে পারে—মানুষকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনা।
জেমস গ্রাহাম 



















